‘লাগে উড়াধুরা’ রেকর্ডের দিনটি দেবশ্রী অন্তরার কাছে ছিল আর দশটা কাজের দিনের মতোই। দুপুরে নিউজ পড়েছেন। এরপর প্রীতম হাসানের কাছে গিয়ে গান গেয়েছেন। রাত ১২টার দিকে উপস্থাপক হিসেবে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গিয়াস উদ্দিন সেলিমের। “মনে হয়েছিল, চারটি লাইন গেয়ে চলে আসব। এ ধরনের কাজ তো নিয়মিতই করি,” বলেন তিনি। কিন্তু ‘তুফান’ ছবির এই গান প্রকাশের পর ইউটিউবের গ্লোবাল ট্রেন্ডিংয়েও জায়গা করে নেয়।
তিন-চার বছর বয়স থেকে গান করছেন অন্তরা। মা বিয়ের আগে জাতীয় পর্যায়ে নাচতেন, বাবা গাইতেন রবীন্দ্রসংগীত। মায়ের কাছে শুনেছেন, দুই বছর বয়সেই গানের তালে পা দিয়ে বিট দিতেন। বাবা ক্যাসেট প্লেয়ার আর টেলিভিশন কিনে এনেছিলেন। বড় ভাই হারমোনিয়ামে প্রথম যে গান তুলে দেন, তা ‘বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে’। মা ঠিক করে দিতেন মঞ্চে কী গাইবেন, কী পরবেন। নাচও শিখেছেন। টেলিভিশনে মাধুরী দীক্ষিতকে দেখে দেখে নাচ অনুকরণ করতেন।
পড়াশোনাতেও ভালো ছিলেন। ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড স্কুলে নার্সারিতে ভর্তি হয়ে প্রথম হয়েছিলেন, ভাই-বোন দুজনই নিজ নিজ শ্রেণিতে প্রথম। স্কুলে মিউজিক ক্লাসের শিক্ষক কৃষ্ণা মিস, মায়া মিস, রতন স্যার ও নিফার ম্যামের কাছে গান শিখতেন। “বিরতিতে অন্যরা খেলত, আমি শিক্ষকদের কাছে গিয়ে বলতাম, আমাকে গান শেখান।” স্কুলে ভাইয়ের ক্লাস শেষ হওয়ার অপেক্ষায়ও শিক্ষকদের কাছে গান শিখতেন। তখন ইউটিউব ছিল না, ক্যাসেট শুনে শুনে তুলতেন। শিল্পী কে, তা-ও সব সময় জানতেন না। ভালো লাগত, তাই গাইতেন।
সপ্তম শ্রেণিতে ছায়ানটে ভর্তি হন। প্রথম চার বছর নজরুলসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, লোকসংগীতসহ নানা ধারার গান শিখেছেন। ভর্তি পরীক্ষায় গেয়েছিলেন মায়ের প্রিয় একটি গান।
২০১৬ সালে বাসায় গাওয়া একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সেই সূত্রে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এক প্রযোজক তাকে ও মুসাফিরকে দিয়ে গান করাতে চান। গানটির সংগীত পরিচালক ছিলেন বাপ্পা মজুমদার। স্টুডিওতে গিয়ে তাকে দেখে অন্তরা এতটাই নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন যে গলা দিয়ে সুর বেরোচ্ছিল না। বাপ্পা বিষয়টি বুঝে স্টুডিও ছেড়ে যান। রেকর্ডিস্ট রুহান পরে ‘স্টেশনের গভীরে’ গানটি রেকর্ড করেন। কিন্তু তার সহশিল্পীর সঙ্গে প্রযোজকের বিরোধে গানটি আলোর মুখ দেখেনি।
২০১৭ বা ২০১৮ সালে আপেল মাহমুদের সঙ্গে একটি মৌলিক গানের ডেমো গেয়েছিলেন, ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করার কথা ছিল। চূড়ান্ত রেকর্ডিংয়ের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা থাকায় বিষয়টি জানান। ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ফোনে জানানো হয়, অন্য কাউকে দিয়ে গানটি করানো হচ্ছে। সেদিন তার জন্মদিন ছিল। “সারা দিন কেঁদেছিলাম,” বলেন তিনি। প্রায় এক বছর পর আপেল মাহমুদ আবার ডাকেন। অন্তরা পরে বুঝেছেন, এ সময়টায় তিনি তাকে নীরবে অনুসরণ করেছেন। তার কাছেই স্টুডিওতে কণ্ঠ দেওয়ার খুঁটিনাটি শিখেছেন। আরাফাত মহসিন নিধির সঙ্গেও কাজ করেছেন। “দুজনই কাজের বাইরে অপ্রয়োজনীয় কথা বলেন না, তাদের কাছে পেশাগত সীমারেখা স্পষ্ট,” বলেন অন্তরা।
একজন ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে অ্যালবামে গান গাওয়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অন্তরা রাজি হননি। পরিবারে সংগীতজগতের কেউ ছিলেন না। বাবা-মা শুরুতে তাকে একা নতুন স্টুডিওতে যেতে দিতেন না। এসব অভিজ্ঞতার পর সিদ্ধান্ত নেন, কোনো প্রযোজকের কাছে গিয়ে কাজ চাইবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে গাইবেন, নিজের মতো থাকবেন। এরপর ধীরে ধীরে জিঙ্গেল ও নাটকের প্লেব্যাকে কাজ বাড়ে। এপেক্সের দুর্গাপূজার ক্যাম্পেইন দিয়ে শুরু, পরে রিন, লাক্স, বিকাশসহ নানা ব্র্যান্ডের জিঙ্গেলে কণ্ঠ দিয়েছেন।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ‘ফুয়াদ লাইভ’ কনসার্টে হাবিব ওয়াহিদের কয়েকটি গান নিয়ে অডিও-ভিজ্যুয়াল পরিবেশনা তৈরি করেছিলেন অন্তরা। সরাসরি যোগাযোগের সাহস হয়নি, তাই ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হাবিবের ফেসবুক পেজে সাত বছরের কাজের পোর্টফোলিও পাঠান। তা দেখে হাবিব তাকে ফোন নম্বর দিয়ে কল দিতে বলেন। পরে প্রথম দেখার দিন স্টুডিওতে তাদের চার ঘণ্টা কথা হয়। সঙ্গে সঙ্গে না হলেও কিছুদিন পর হাবিবের সুরে ‘প্রেমে পড়া মন’ গানটি আসে। এরপর এল ‘মন বোঝে না’। হাবিবের সঙ্গে ফ্রুটিকা ও প্রাণ আপের জিঙ্গেলও করেছেন।
প্রীতম হাসান ‘লাগে উড়াধুরা’র জন্য হাবিবের সঙ্গে করা কাজগুলো দেখেই তাকে ডেকেছিলেন। গানটির সাফল্যের সময়ই কঠিন সময় পার করেছেন অন্তরা। বাবার পেসমেকার বসাতে হয়, বাবাকে অনেকবার মৃত্যুর কাছাকাছি যেতে দেখেছেন। এসবের মানসিক ধাক্কায় ঘুমাতে পারতেন না। চিকিৎসকের সাহায্য নিয়েছেন, কাউন্সেলিং করেছেন, শিখেছেন আবেগ সামলাতে। তার আগে ২০২৫ সালের শেষ দিকে স্টুডিও থেকে ফেরার পথে সিঁড়িতে পড়ে হাঁটুতে ১০টি সেলাই লেগেছিল। সব মিলিয়ে মাঝে বেশ খানিকটা গান থেকে দূরে ছিলেন।
পরিবার শুরু থেকেই চায়নি সংগীত তার একমাত্র পেশা হোক। অন্তরাও এখন একমত। তার যুক্তি, বাংলাদেশে খুব কম শিল্পীই সংগীত থেকে নিয়মিত আয় করতে পারেন। প্রযোজনা বা সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে নিয়মিত কাজ থাকে, কিন্তু কণ্ঠশিল্পীর কাজ পাওয়া অনেকটাই নির্ভর করে অন্যের পছন্দের ওপর।
সম্প্রতি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তবে গানগুলো মুক্তির আগে সেগুলোর নাম বলতে চান না। ২০২২ সাল থেকে নিজে গান লিখছেন। সামনে ইচ্ছে আছে গানগুলো প্রকাশের। ‘স্কাই’ আসবে এ বছরই। যেটির সঙ্গে বাংলাদেশের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও ইউক্রেন যুক্ত আছে।


