স্কোরবোর্ডের ৭-১ ব্যবধানটা বড় নিষ্ঠুর। তবে প্রথমবার বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখা এক চিলতে দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাওয়ের জন্য জার্মানির বিপক্ষের এই রাতটি কেবল সাত গোল হজমের ছিল না। জার্মানির মুখোমুখি হওয়া ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চ। তাই বাংলাদেশ সময় রোববার রাতের এই বড় পরাজয় ছাপিয়েও ফুটবল দুনিয়ায় বড় হয়ে উঠেছে দেড় লাখ মানুষের এক দেশের অদম্য সাহস আর স্বপ্ন পূরণের গল্প।
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে দেখা গেল এক সুন্দর দৃশ্য। সাধারণত এত বড় হারের পর সমর্থকেরা মুখ লুকিয়ে মাঠ ছাড়েন। কিন্তু কুরাসাওয়ের ভক্তরা গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে রইলেন, প্রিয় দলের জন্য গলা ফাটালেন, গান গাইলেন। আসলে তাদের কাছে এটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ ছিল না, এটি ছিল বিশ্ব মানচিত্রে কুরাসাওয়ের নাম চিরতরে খোদাই করার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
মানচিত্রে ক্ষুদ্র, সাহসে বিশাল
চলতি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮টি দেশের মধ্যে কুরাসাও আয়তন ও জনসংখ্যা–উভয় দিক থেকে সবচেয়ে ছোট। ক্যারিবিয়ান সাগরের বুকে ভেনেজুয়েলা উপকূল থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটির মোট জনসংখ্যা মাত্র ১ লাখ ৫৮ হাজারের কাছাকাছি। এর ৪৪৪ বর্গকিলোমিটারের আয়তনটি আমাদের ঢাকা জেলার তিন ভাগের এক ভাগও নয়। আরও সহজ করে বললে, ঢাকার মিরপুরের চেয়ে ১০ গুণ এবং উত্তরার চেয়ে অন্তত ২০ গুণ কম মানুষ বাস করেন এই ভূখণ্ডে।
ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ আমেরিকার কাছে হলেও কুরাসাও মূলত ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডসের অধীনে থাকা একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ২০১০ সালে ডাচদের একটি রাজনৈতিক ইউনিট ভেঙে যাওয়ার পর এটি এই মর্যাদা পায়। ডাচ সংস্কৃতির গভীর প্রভাব থাকা এই অঞ্চলের অফিশিয়াল ভাষা তিনটি–ডাচ, ইংরেজি এবং স্থানীয় ‘পাপিয়ামেন্তু’।
কুরাসাও নামের পেছনে জড়িয়ে আছে তাদের একটি বিখ্যাত পানীয়র নাম। এই দলের ফুটবলীয় কাঠামোও ডাচদের ওপর দারুণভাবে নির্ভরশীল। ২৬ জনের বর্তমান বিশ্বকাপ স্কোয়াডের মধ্যে একমাত্র উইঙ্গার তাহিথ চং ছাড়া বাকি ২৫ জনের সবার জন্ম মূল ভূখণ্ড নেদারল্যান্ডসে। এমনকি দলের ১৬ জন খেলোয়াড় বয়সভিত্তিক ফুটবলে একসময় ডাচদের জার্সি গায়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন।
বিশ্বজুড়ে কৌতূহল ও সমর্থকদের গর্ব
আন্তর্জাতিক ফুটবলে কুরাসাওয়ের পথচলা মাত্র ১৫ বছরের। এই অল্প সময়ে তারা এমন এক রূপকথা লিখল যে, জার্মানির জালে বল জড়ানোর পরপরই বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট দুনিয়ায় কুরাসাওকে নিয়ে হইচই পড়ে যায়। গুগলে লাখো মানুষ একসঙ্গে খুঁজতে শুরু করেন–কোথায় এই দেশ, কেমন তাদের জীবনযাত্রা। বিজ্ঞাপন বা রোডশো করে কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও একটি দেশের পক্ষে যে বৈশ্বিক পরিচিতি পাওয়া অসম্ভব ছিল, ফুটবলের এক রাতের জাদু কুরাসাওকে তা এনে দিয়েছে।
তাই তো মাঠের অমন হারের পরেও সমর্থকদের মনে হতাশার কোনো ছাপ ছিল না। কুরাসাও থেকে খেলা দেখতে আসা ক্যারোলিন স্লুইস আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমরা ছোট্ট এক দ্বীপের বাসিন্দা, অথচ আমরা এখন বিশ্বকাপের মাঠে।’ সমর্থক স্যান্ডি মার্টিনা যেমন বলছিলেন, ‘ঘরের মাঠে যে শিশুরা আজ এই ম্যাচ দেখল, তারা জানবে যে মানুষের স্বপ্নের কোনো সীমানা থাকতে নেই।’
শূন্য থেকে পরাশক্তিদের কাতার
২০১০ সালের আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই দ্বীপগুলোর আলাদা কোনো অস্তিত্ব ছিল না, তারা খেলত ‘নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলস’ নামে। ২০১১ সালে একক দেশ হিসেবে ফিফার সদস্যপদ পাওয়ার সময় কুরাসাওয়ের র্যাঙ্কিং ছিল ১৫১তম। সেখান থেকে অসাধারণ ধারাবাহিকতায় উন্নতি করে তারা এখন ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ৮২ নম্বর দল।
এই বদলে যাওয়ার নেপথ্যে ছিলেন একঝাঁক ডাচ মাস্টারমাইন্ড। প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট কিংবা গুস হিডিঙ্কের মতো বিশ্বখ্যাত কোচরা বিভিন্ন সময়ে এই দলটির ডাগআউট সামলেছেন। বর্তমানে দলটির কোচের দায়িত্বে আছেন কিংবদন্তি ডিক অ্যাডভোকাট, যার অধীনে কনকাকাফ অঞ্চলের বাছাইপর্বে অপরাজিত থেকে মূল পর্বের টিকিট কাটে কুরাসাও। ৭৮ বছর বয়সী অ্যাডভোকাট এবার বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হিসেবে ডাগআউটে দাঁড়িয়ে নতুন এক রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন।
স্কোয়াডের পরিচিত মুখ ও সামনের পথ
কুরাসাও দলটিতে এমন কিছু মুখ আছেন, যাদের ইউরোপিয়ান ফুটবলের দর্শকেরা বেশ ভালো করে চেনেন। দুই ভাই জুনিনহো ও লিয়ান্দ্রো বাকুনা দীর্ঘদিন ইংলিশ লিগে খেলেছেন; লিয়ান্দ্রোর তো অ্যাস্টন ভিলার হয়ে প্রিমিয়ার লিগ খেলার অভিজ্ঞতাও আছে। আর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একাডেমি থেকে উঠে আসা তাহিথ চং বর্তমানে খেলছেন শেফিল্ড ইউনাইটেডে। পোস্টের নিচে থাকা ৩৭ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক এলয় রুমও পিএসভি আইন্দহোফেনের মতো বড় ক্লাবে খেলে এসেছেন।
বিশ্বকাপের ‘ই’ গ্রুপে জার্মানি ছাড়াও কুরাসাওয়ের বাকি দুই প্রতিপক্ষ ইকুয়েডর ও আইভরি কোস্ট। আগামী শনিবার কানসাস সিটিতে ইকুয়েডরের বিপক্ষে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে মাঠে নামবে তারা। প্রথম ম্যাচে স্কোরবোর্ডে তারা হারলেও ফুটবল বিশ্বকে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেওয়ার যে মিশন নিয়ে এই ক্ষুদ্র দেশটি এসেছিল, তাতে তারা প্রথম দিনেই শতভাগ সফল।


