রাজধানীর ধানমন্ডিতে চিকিৎসক ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় অবহেলাজনিত মৃত্যু, নির্যাতন এবং পোস্টমর্টেম ছাড়াই দাফনের মাধ্যমে আলামত গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে মামলার আবেদন করেন নিহতের স্বজন মো. মশিউর রহমান শাহ। আদালত আবেদনটি গ্রহণ করে সিআইডিকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ফরহাদ হোসাইন এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলায় চারজনকে আসামি এবং আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। আসামিরা হলেন নিহতের শাশুড়ি সিদ্দিকা সুলতানা, স্বামী ডা. রহমত রশীদ, শ্বশুর ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশীদ (বারডেম হাসপাতালের কার্ডিয়াক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান) এবং ইয়ার্কি ডটকমের সম্পাদক সিমু নাসের।
মামলার আবেদনে বলা হয়, পড়াশোনার সময় ধীপ্রার সঙ্গে সহপাঠি রহমত রশীদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে তারা বিয়ে করেন। তাদের ২ বছর বয়সী একটি ছেলে আছে। ধীপ্রা অপেক্ষাকৃত কম স্বচ্ছল পরিবার থেকে আসায় বিয়ের পর থেকেই অভিযুক্তরা তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতে থাকে। ক্রমাগত মানসিক নির্যাতনের কারণে তিনি তীব্র হতাশায় আক্রান্ত হন এবং সন্তান প্রসবের পর পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশনসহ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভুগতে থাকেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ধীপ্রার স্বামী ও শ্বশুর নিজেরা চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও তার চিকিৎসার খরচ না দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করেন। এমনকি তার এফসিপিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতেও তারা অন্যায়ভাবে বাধা দেন।
মৃত্যুর কিছুদিন আগে ধীপ্রা ‘ফিমেল ডক্টরস ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপেও তার ওপর হওয়া পারিবারিক নির্যাতনের কথা বেনামে পোস্ট করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে বাদি জানান, গত ২ জুন থেকে টানা তিন দিন আসামিরা ধীপ্রাকে রুমে তালাবদ্ধ করে রাখে। এই তিন দিন তাকে কোনো খাবার দেওয়া হয়নি এবং তার ২ বছরের সন্তানকেও দেখতে দেওয়া হয়নি। গত ৪ জুন খবর পেয়ে তার মা ধানমন্ডিতে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যান। সেখানে মেয়েকে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখে তালা খুলে দেওয়ার অনুরোধ করলে স্বামী তালা খুলে দেন। ঘর থেকে মুক্ত হয়েই ধীপ্রা তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘মা, আমি ভাত খাব।’ এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।
আলামত ধ্বংস ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ এনে মামলার আবেদনে আরও বলা হয়, ধীপ্রা মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে তাকে নিকটস্থ কোনো হাসপাতালে না নিয়ে আসামিরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করতে থাকেন। পরে শ্বশুর ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশীদের প্রভাব ব্যবহার করে চিকিৎসার নামে দূরের বারডেম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই ধীপ্রার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আসামিরা তাদের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে কোনো প্রকার ময়নাতদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি করে একটি মিথ্যা ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করান এবং দ্রুত দাফন সম্পন্ন করেন।
এটি ধীপ্রার স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, বরং সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং আলামত ধ্বংসের একটি চেষ্টা বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী জানান, আসামিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় এবং নিহতের মা-বাবা অত্যন্ত ধর্মভীরু ও অসহায় হওয়ার কারণে শুরুতে আইনি পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব হয়েছিল। মঙ্গলবার আদালতের কাছে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে জেলহাজতে আটকে রাখার এবং সুনির্দিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আবেদন জানানো হয়েছে।


