নতুন ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’র আওতায় বাংলাদেশ ৭ হাজার ১৩২টি মার্কিন শুল্ক ধাপে ধাপে বা তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে। বিষয়টি দেশের বাণিজ্য ইতিহাসে অন্যতম বড় বাজার খুলে দেওয়ার উদ্যোগ। রোববার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস উইং এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৪ হাজার ৯২২টি শুল্ক লাইন চুক্তি সইয়ের দিন থেকেই শুল্কমুক্ত হবে, যার মধ্যে ৪৪১টি লাইনে আগেই শূন্য শুল্ক ছিল। আরও ১ হাজার ৫৩৮টি লাইনে পাঁচ বছরে শুল্ক শূন্যে নামানো হবে। প্রথম বছরে ৫০ শতাংশ কমানো হবে এবং বাকি ৫০ শতাংশ পরবর্তী চার বছরে সমানভাবে কমবে।
অন্যদিকে, ৬৭২টি লাইনে একই পদ্ধতিতে ১০ বছরে শুল্ক তুলে দেওয়া হবে। ৩২৬টি লাইন শুল্কমুক্ত সুবিধার বাইরে থাকবে, যার মধ্যে বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির প্রস্তাব তালিকার ৮১টি বিশেষ সুবিধাভুক্ত লাইন রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের এ কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য পারস্পরিক শুল্ক চুক্তির তুলনায় আলাদা, যেখানে এমন পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা ছিল না।
বিনিময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্য। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাক শূন্য পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা পাবে। ফলে যোগ্য রপ্তানিতে ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে না।
বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্রে মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক, ফলে এ বিধান প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। সরকার জানায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো আগে অন্য দেশ থেকে আমদানি হতো। ফলে মোট আমদানি ব্যয় বাড়বে না, বরং উৎস পরিবর্তন হবে।
উৎপত্তি বিধিতে দেশীয় বা বিদেশি মূল্য সংযোজনের নির্দিষ্ট সীমা উল্লেখ নেই, যা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে পারে।
চুক্তিতে পণ্য, সেবা, শুল্ক প্রক্রিয়া, বাণিজ্য সুবিধা, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-বাণিজ্য, সরকারি ক্রয়, শ্রম, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা নীতি, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কর্মকর্তারা বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বৌদ্ধিক সম্পত্তি অধিকার সংক্রান্ত চুক্তি, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের বাইরে নতুন কোনো শর্ত আরোপ করা হয়নি।
চুক্তিতে কাগজবিহীন বাণিজ্য, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা জোরদার এবং ইলেকট্রনিক আদান-প্রদানে শুল্ক আরোপ না করার স্থায়ী সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মেডিকেল যন্ত্র ও ওষুধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের সনদ স্বীকৃতি, খাদ্য ও কৃষিপণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিধি গ্রহণ, যানবাহনে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা মান স্বীকৃতি এবং পুনর্নির্মিত পণ্য আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মৎস্য ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা, পরিবেশ সুরক্ষা, বন্যপ্রাণী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী শ্রম আইন হালনাগাদের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
ডিজিটাল বাণিজ্যে সীমান্ত-পার তথ্য প্রবাহের কাঠামো স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সহযোগিতার উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে বোয়িং উড়োজাহাজ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস, সয়াবিন, গম, তুলা ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানি বাড়ানোর উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
আগের মার্কিন পারস্পরিক শুল্ক ব্যবস্থার তুলনায় এ চুক্তিতে নির্দিষ্ট শর্তে বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে।
চুক্তিটি গত কছরের ২ এপ্রিল জারি হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাহী আদেশ ১৪২৫৭-এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্পাদিত হয়, যার মাধ্যমে প্রায় সব বাণিজ্য অংশীদারের ওপর পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে আলোচনায় অংশ নেওয়া দেশগুলোর জন্য ৩০ আগস্ট বাংলাদেশে আরোপিত শুল্ক হার ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় নয় মাসের আলোচনার পর চূড়ান্ত হার ১৯ শতাংশে নামানো হয়।
সরকার আশা করছে, এ চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হবে।


