৬ জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, দেড় লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী

৬ জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, দেড় লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী
তিস্তার প্লাবনে তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চল। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা, ধরলা, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, গড়াইসহ বিভিন্ন নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে অন্তত ছয় জেলার নিম্নাচল তলিয়ে দেড় লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় নীলফামারির ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি যা বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

একই সময়ে কাউনিয়া পয়েন্টে পানির উচ্চতা বিপৎসীমার ১৯ সেন্টিমিটার নিচে, ধরলার পানি শিমুলবাড়ি পয়েন্টে বিপৎসীমার ১২ সেন্টিমিটার নিচে এবং পাটগ্রাম পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৮৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

পাউবো জানিয়েছে, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে এ মুহূর্তে লালমনিরহাটে অন্তত ৬০ হাজার, রংপুরে ৩০ হাজার, কুষ্টিয়ায় ৫০ হাজার, নীলফামারিতে ১০ হাজার এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছয় হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে তিস্তা অববাহিকার ১৫২ কিলোমিটার এবং ধরলা-ব্রহ্মপুত্র অঞ্চলে ৩৬০ কিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চর অঞ্চল এবং নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ এখন পানিবন্দী। এসব এলাকার চিনাবাদাম, পাট এবং নতুন করে রোপন করা আমন ধানের হাজার হাজার হেক্টর জমি পানিতে ডুবে গেছে। অনেক পুকুর প্লাবিত হওয়ার পথে। নদীর তীরবর্তী ভাঙনও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে রয়েছে। ভেঙে গেছে চর এলাকার রাস্তাঘাট ও সেতু। পানিতে আটকে পড়া পরিবারগুলো শিশু, বৃদ্ধ এবং গৃহপালিত প্রাণিদের নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। আত্মীয়-স্বজনদের দেওয়া শুকনো খাবারই তাদের একমাত্র ভরসা । এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং শৌচাগারের সমস্যাও দেখা দিয়েছে।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, পঞ্চগড় আর রংপুরে তো বৃষ্টি হয়েছেই, সেই সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার ও আসামের গুয়াহাটিতেও প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া, আগামী ২৪ ঘন্টায় দেশের রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন উজানে পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, আসাম, মেঘালয় এবং ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

পাউবো জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতে ক্রমাগত ভারী বৃষ্টির কারণে তিস্তার নিম্নাঞ্চলে পাঁচটি জেলার ১৪টি উপজেলায় পানি বেড়েছে। তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনেশ্বরী, টাঙ্গন, পুনর্ভবা, ইছামতি নদীর নিম্নাঞ্চলের চর এলাকা এবং গ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে। ভাঙন দেখা দিয়েছে। এছাড়াও, তিস্তার পানি বিপদসীমার উপরে চলে যাওয়ায় নদী-তীরবর্তী বাঁধে আঘাত লাগার ফলে নানা জায়গায় ভেঙে যাওয়ার শংঙ্কা দেখা দিয়েছে। চাপ সামলাতে ডালিয়া ব্যারেজের ৪৪টি জলের গেট খোলা হয়েছে।

আরও পড়ুন

পানি বৃদ্ধিতে লালমনিরহাটের আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা, সদর ও পাটগ্রাম উপজেলার শতাধিক গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে তিস্তার বাম তীরবর্তী এলাকায় তৃতীয় দফায় বন্যা দেখা দিয়েছে। ডুবে গেছে গ্রামীণ সড়ক, বসতভিটা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ফসলি জমি ও গবাদি পশুর খামার।

বিপৎসীমার ওপরে বইছে তিস্তা, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত। ছবি: টাইমস

আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে তিস্তা, ধরলা এবং দুধকুমার নদীর পানির স্তরও বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। তখন নদী তীরের আরও অনেক নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। পাহাড়ি এলাকা এবং ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে এই অঞ্চলে বড় ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে বলেও শঙ্কার কথা জানিয়েছে পাউবো।ি

পাউবো, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কার্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ যৌথভাবে জানিয়েছে, তিস্তার পানি বাড়াতে নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা, পাটগ্রাম, কালিগঞ্জ এবং আদিতমারীর নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল, চর ও দ্বীপ চরের এলাকা প্লাবিত হয়েছে। লালমনিরহাট, রাজারহাট, উলিপুর, চিলমারী, নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী, কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী এবং গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জও প্লাবিত হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে এই ৫ জেলার চর এলাকার ২২৫টি গ্রামে বন্যার পানি ঢুকে প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তিস্তা ও ধরলা সহ এই অঞ্চলের অববাহিকায় কমপক্ষে ১০৮টি স্থানে ছোট-বড় ভাঙন দেখা গেছে। পাউবো অনেক জায়গায় ভাঙন রোধে কাজ করছে।

অন্যদিকে, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় প্রতিদিনই বাড়ছে পদ্মা ও গড়াই নদীর পানি। গত এক সপ্তাহে পদ্মা নদীতে পানি বেড়েছে প্রায় ১৫০ সেন্টিমিটার। ভারি বর্ষণ ও ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢল এ পানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সবশেষ উপজেলার ভাগজোত পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয় ১৪.৭২ মিটার, যা বিপদসীমা (১৫.৭০ মিটার) থেকে ৯৮ সেন্টিমিটার নিচে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি ছিল ১২.৮৯ মিটার এবং গড়াই নদীর পানি ১১.২৭ মিটার, যা বিপৎসীমার চেয়ে মাত্র এক সেন্টিমিটার নিচে। প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ২০ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে।

পানি বৃদ্ধির ফলে নদীরপাড়ের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে প্রায় এক হাজার হেক্টর ফসলি জমি। চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে দুই ইউনিয়নের ১৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান। প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মরিচ, কলা, ধানসহ বিভিন্ন ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। চরাঞ্চলের নিম্নভূমি ও আবাদি জমি ডুবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বন্যার শঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন নদী পাড়ের মানুষ।

জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।’

পাবনা ওয়াটার হাইড্রোলজি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুজ্জামান জাহিদ জানিয়েছেন, পদ্মা ও গড়াই নদীর পানি বৃদ্ধি কতদিন চলবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

 

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর