বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকা থেকে বাদ পড়ার ক্ষোভে আগামী নির্বাচনে অনেকেই ঘোষণা দিচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার, তাতে বেশ কঠিন অবস্থায় পড়েছে দলটি।
দলের নেতারা বলছেন, যেসব আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়বেন, সেখানে দলের ভেতর থেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতি থাকলে ভোট ভাগ হয়ে পড়বে।
তাদের ভাষ্যে, এতে করে সুযোগ বাড়বে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দলের প্রার্থীদের। আর বড় ধরনের বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়বেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা।
এই অবস্থায় ক্ষোভ প্রশমনের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। দলের সিনিয়র নেতারা মনোনয়ন বঞ্চিতদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন, বিভিন্ন আশ্বাস দিচ্ছেন এবং দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিতে তাদের রাজি করাচ্ছেন।
৩ নভেম্বর বিএনপি ২৩৭টি আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন দেয়। এর মধ্যে ৪৫টির মতো আসনে বাদ পড়াদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা গেছে। তার মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৫টি আসনে মনোনয়নবঞ্চিত নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, বাকি ৬৩টি আসনের মনোনয়ন তালিকা নির্বাচনসূচি ঘোষণার আগেই চূড়ান্ত করা হবে। এর মধ্যে ৪০টির বেশি আসন জোটের শরিকদের দেওয়া হতে পারে। এছাড়া বেশ কয়েকটি আসনে প্রার্থী বদলানোর সম্ভাবনাও আছে।
চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণার পর বিশেষ করে যেসব আসন জোটের শরিকদের দেওয়া হবে, অথবা যেসব আসনে প্রার্থী বদল হবে তা নিয়ে দলের ভেতরে আবারও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
বিএনপির বহু নেতা স্বীকার করেন, গত ১৭ বছরে জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের যোগাযোগ খুব কম ছিল। ফলে বছরের পর বছর মামলায়–রাজনৈতিক দমন–পীড়নে থাকা তৃণমূল কর্মীরা শরিক দলের প্রার্থীর জন্য ততটা উদ্যমীভাবে কাজ করবেন না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বড় দলে মনোনয়ন নিয়ে কিছু অসন্তোষ থাকেই। অনেকে একই আসনে যোগ্য থাকায় সবাইকে মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব না। তবুও শেষ পর্যন্ত কেউই দলীয় প্রতীকে বাইরে যাবে না।’
শরিকদের দেওয়া আসনগুলোতে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘বড় দল হিসেবে বিএনপি সেসব সংকট উত্তোরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।’
নাটোর-১ (লালপুর–বাগাতিপাড়া) আসনে বিএনপির সহকারি দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু বড় ধরনের শক্তি প্রদর্শন করে প্রতিবাদ জানান, কারণ দলটি মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য ফারজানা শরমিন পুতুলকে।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘এই মনোনয়ন পরিবর্তন না হলে জনগণের দাবি অগ্রাধিকার দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়ব। আশা করি যারা এতদিন মাঠে থেকেছে দল তাদের স্বীকৃতি দেবে এবং তৃণমূলের ইচ্ছা–আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেবে।’
বিএনপির ভেতরে এমন বিরোধে এসব আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীরা লাভবান হবেন বলে মত অনেকের।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, ‘অন্য দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ কাজে লাগানোর উদ্দেশ্য আমাদের নেই। তবে নির্বাচনী মাঠে নানা কৌশল থাকে, আর প্রার্থীরা বিজয় নিশ্চিত করতে স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো ব্যবহার করেন।’
বিতর্কিত আসনগুলোর ক্ষোভ
সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি–কলারোয়া) আসনে বিএনপি প্রার্থী কাজী আলাউদ্দিনকে সরিয়ে শহিদুল আলমকে মনোনয়ন দিতে টানা অবরোধ–হরতাল চলছে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা ঘোষণা দিয়েছেন, মনোনয়ন পরিবর্তন না হলে দলের প্রার্থীর পক্ষে তারা কাজ করবেন না।
মাগুরা-২ (শালিখা–মহম্মদপুর) আসনে অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়ায় সাবেক জেলা বিএনপি সভাপতি ও তিনবারের সাবেক এমপি কাজী সলিমুল হক কামাল স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
ঢাকা-১৪ আসনে দারুসসালাম থানা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক এসএ সিদ্দিক সাজুকে শোকজ করা হয়েছে, কারণ তিনি মায়ের ডাকের প্রতিষ্ঠাতা সানজিদা ইসলাম তুলিকে মনোনয়ন দেওয়ার প্রতিবাদে মশাল মিছিল করেছেন এবং তাকে বয়কটের ডাক দিয়েছেন।
সাতক্ষীরা-২ (সদর–দেবহাটা) আসনে বহিষ্কৃত নেতা আবদুর রউফকে মনোনয়ন দেওয়ায় ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। স্থানীয় নেতাদের দাবি, প্রার্থী হওয়া উচিত আবদুল আলীম।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল–আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের অংশ) আসনে এখনো বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করেনি। গুঞ্জন রয়েছে জমিয়ত নেতা জুয়ায়েদ আল হাবিব মনোনয়ন পেতে পারেন। বিএনপির আলোচিত নেতা রুমিন ফারহানা মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
নোয়াখালী-৫ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় গ্রামীণ উন্নয়ন সম্পাদক বজলুল করিম চৌধুরীর সমর্থকেরা টানা আন্দোলন করছেন। তারা চান, তার বদলে ফখরুল ইসলামকে মনোনয়ন দেওয়া হোক। ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিএনপির ভেতরে এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে।
সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর–শান্তিগঞ্জ) আসনে সাবেক জেলা বিএনপি ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তার দাবি, যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এম কায়সার আহমদকে ভুলভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আখতারুল আলম ফারুক মনোনয়ন পাওয়ায় সাবেক বিএনপি এমপি শামছুদ্দিন আহমদের ছেলে তানভীর আহমদ রানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন।
জামালপুর-১ (দেওয়ানগঞ্জ–বকশীগঞ্জ) আসনে কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ ও সাবেক এমপি এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের মনোনয়নের বিপরীতে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রউফ তালুকদার স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন।
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে কাজী মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন মনোনয়ন পাওয়ায় নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ চলছে। আসলাম চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছেন, মনোনয়ন পরিবর্তন না হলে তিনি স্বতন্ত্র পদে লড়বেন।
পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা–দশমিনা) আসনটি গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে দেওয়া হতে পারে এমন জোরালো জল্পনা চলছে। বিএনপি নেতা হাসান মামুনের সমর্থকেরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, নুর মনোনয়ন পেলে তারা নির্বাচন বর্জন করবেন।
এ ছাড়া ঢাকা-১২, ঢাকা-১৫, নারায়ণগঞ্জ-২, নারায়ণগঞ্জ-৩, কুমিল্লা-৬, কুমিল্লা-৯, টাঙ্গাইল-৩, দিনাজপুর-২, নওগাঁ-২, চাঁদপুর-২, চাঁদপুর-৪, সুনামগঞ্জ-১ ও সুনামগঞ্জ-৫, ফরিদপুর-৩, রাজবাড়ী-১, টাঙ্গাইল-১ ও টাঙ্গাইল-২, কুষ্টিয়া-২, কুষ্টিয়া-৩ ও কুষ্টিয়া-৪, গাইবান্ধা-৪, পাবনা-৩, পাবনা-৪, জয়পুরহাট-১, জয়পুরহাট-২, নওগাঁ-২, চট্টগ্রাম-১২ ও চট্টগ্রাম-১৩, কুষ্টিয়া-৪, সিলেট-৬, ফেনী-২সহ আরও বেশ কিছু আসনে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে।


