জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। আর তাদের এই অবস্থান অন্তর্বর্তী সরকারকে ফেলেছে চাপের মুখে। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ দেশে স্থিতিশীলতা আনার পরিবর্তে বরং উসকে দিয়েছে নতুন উত্তেজনা। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী উভয়ই সরকারকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে দুষছে।
অবশ্য সরকার সবার সম্মতির মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আর তাই দলগুলোর আস্থা তৈরির জন্য সকল আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন যে, এই রাজনৈতিক বিভাজন পরবর্তী নির্বাচনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। যে নির্বাচনটি এরই মধ্যে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে এক বিশ্লেষক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রধান দলগুলো যদি নিজেদের বিভেদ কমিয়ে একটি আপোসে না পৌঁছায়, তবে এই সংকট শেষ পর্যন্ত খোদ নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই হুমকির মুখে ফেলতে পারে।’
তার মতে, দলগুলোর মধ্যকার এই সংঘাতপূর্ণ অবস্থান মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে চাপের মধ্যে ফেলছে।
সনদ বাস্তবায়নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ জমা দেওয়ার পর সেখানে ‘গণভোটের দিনক্ষণ’ এবং নোট অব ডিসেন্ট’ তুলে দেওয়াকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি।
উদ্ভুত পরিস্থিতে সরকার যে চাপে আছে তাও উপদেষ্টাদের কথাতেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সস্মেলনে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র বিরোধে সরকার কী করবে বুঝতে পারছে না। ২৭০ দিন আলাপ আলোচনার পর এমন অনৈক্যের সুর হতাশাব্যাঞ্জক।’
গণভোটের ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টা দ্রুতই সিদ্ধান্ত দেবেন বলেও জানান এই উপদেষ্টা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কমিশনের সুপারিশের পর গণভোট নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত মুখোমুখী অবস্থানে থাকায় সরকারের উপর চাপ বাড়ছে। এক্ষেত্রে সরকারকে বুঝেশুনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘দল দুটির মধ্যে বিভাজন থাকলেও দিনশেষে একটা সমঝোতা হবে। কারণ, দুই দলই নির্বাচন ঝুলিয়ে দিয়ে পতিত আওয়ামী লীগকে সুযোগ করে দিতে চাইবে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপিকে নানাক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ করে জামায়াত শক্তির জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় না পৌঁছলে সংকট তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।’
একইদিনে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন চায় বিএনপি। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সস্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট মানবে না বিএনপি। এছাড়া সনদের চূড়ান্ত সুপারিশে নোট অব ডিসেস্ট তুলে দিয়ে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রতারণা করেছে।’
বিষয়টি নিয়ে তারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করবেন বলেও জানান।
বিএনপির মহাসচিবের সংবাদ সম্মেলনের পরপরই জরুরি সংবাদ সস্মেলন ডাকে জামায়াত। সেখানে দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, সংসদ নির্বাচনের আগেই নভেম্বরে গণভোট চান তারা। শুক্রবারের মধ্যেই গণভোটের আদেশ জারি করতে সরকারকে আহ্বানও জানান তিনি।
এর আগে সকালে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ সমমনা আটটিল দল গণভোটের ব্যবস্থা করতে নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি জমা দেয়।
এনসিপিও গণভোট চায় তবে, নির্বাচনের আগে বা একইদিন গণভোট নিয়ে তাদের তেমন ভাবনা নেই। তারা মূলত গুরুত্ব দিচ্ছে সনদ বাস্তবায়নে।
দলগুলোর এমন পাল্টাপাল্টি অবস্থান দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের। ফলে শেষ পর্যন্ত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান হবে কিনা তা নিয়েও এক ধরনের শঙ্কা দানা বাঁধছে।
এ প্রসঙ্গে সিনিয়র আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনু হেনা রাজ্জাকী বলেন, ‘দলগুলোর বিভাজন থাকলে সরকারের ওপর চাপ বাড়বে এটা স্বাভাভিক। সরকার যেহেতু রেফারির ভূমিকায় রয়েছে তাই প্রকৃত রেফারির কাছে সবাই সঠিকটাই আশা করে। সরকার কারও চাপে বাস্তবতা বদলাতে পারে না। আর নির্বাচনের স্বার্থে বিএনপি ও জামায়াত সমঝোতায় না এলে ভোট ঝুলে যেতে পারে।’
গণভোটে পাস অথবা সরকারি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি তৈরি না করলে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
কারণ হিসেবে বললেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা তো সংবিধানে নেই। অর্থাৎ সংবিধান কার্যকর নেই। তাই জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি তৈরি করতে অনেকেই গণভোট আগে চাইছেন। যার ভিত্তিতে ভোট হবে। তবে, গণভোটে পাস না হলেও অবশ্য ঝুঁকি আছে।’
এর আগেও জুলাই সনদ সনদে সই করা নিয়ে দলগুলোতে বিভাজন দেখা যায়। বাস্তবায়নের স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় গত ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত স্বাক্ষর অনুষ্ঠান বর্জন করে এনসিপিসহ চারটি বাম রাজনৈতিক দল। তারা এখনো সনদে সই করেনি।
অন্যদিকে জামায়াত ও সমমনা দলগুলো অনুষ্ঠানে গেলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্পষ্ট না থাকায় সরকারের কঠোর সমালোচনা করে মাঠের কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। যদিও সেসময় বিএনপি সরকার বা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল।
এখন অবশ্য পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। সরকার এখন আটকে গেলে দলগুলোর অব্যাহত দাবি, আস্থার সংকট এবং আসন্ন নির্বাচনের ঘোষিত সময়সূচির বেড়াজালে।


