২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে দেশে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ১৪৩ জন আহত হয়েছেন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছর।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল এবং এগুলোর একটি বড় অংশ চালান কিশোর ও তরুণেরা।
ভারী যানের ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬ হাজার ৩১৪টি বা ৩৯ দশমিক ৩০ শতাংশ ঘটেছে ভারী যানবাহনের ধাক্কায়।
এরপর মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ৫ হাজার ৪৯৭টি বা ৩৪ দশমিক ২২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটেছে ৩ হাজার ৫৪৮টি বা ২২ দশমিক ০৯ শতাংশ দুর্ঘটনা। অন্যান্য কারণে ঘটেছে ৭০৬টি বা ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনায় পণ্যবাহী যানের দায় সবচেয়ে বেশি
পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ বা ৬ হাজার ৪৮১টির জন্য দায়ী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর, ট্রলি ও লরিসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী যানবাহন।
মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী ৫ হাজার ৮৩১টি বা ৩৬ দশমিক ৩০ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য। বাসচালকের কারণে ঘটেছে ২ হাজার ১৬৪টি বা ১৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ দুর্ঘটনা।
এ ছাড়া থ্রি-হুইলারের কারণে ৭৩২টি বা ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের কারণে ৪৩৮টি বা ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ, পথচারীর কারণে ২৯৬টি বা ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং বাইসাইকেল ও রিকশার কারণে ১২৩টি বা শূন্য দশমিক ৭৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
আঞ্চলিক সড়কে দুর্ঘটনা বেশি
সড়কের ধরন অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। সাড়ে ছয় বছরে এসব সড়কে ৬ হাজার ৬৮৯টি বা ৪১ দশমিক ৬৪ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে ৪ হাজার ৭৭৩টি বা ২৯ দশমিক ৭১ শতাংশ দুর্ঘটনা। শহরের সড়কে ২ হাজার ৬৪৬টি বা ১৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং গ্রামীণ সড়কে ১ হাজার ৯৫৭টি বা ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
কিশোর-তরুণদের বেপরোয়া গতির প্রবণতা
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশ মোটরসাইকেল। এগুলোর একটি বড় অংশ কিশোর ও তরুণেরা চালান। তাদের মধ্যে বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা বাড়ছে।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপস্থাপনাও কিশোর-তরুণদের অতিরিক্ত গতিতে মোটরসাইকেল চালাতে উৎসাহিত করছে। তাঁরা গতির মধ্যে রোমাঞ্চ অনুভব করেন। ফলে মোটরসাইকেলচালকেরা নিজেরা দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পাশাপাশি পথচারীসহ অন্যান্য সড়ক ব্যবহারকারীদেরও দুর্ঘটনার শিকার করছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ভাষ্য, বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের অধিকাংশ চালক শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। তাঁরাও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে মোটরসাইকেলকে চাপা বা ধাক্কা দিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৫৮ শতাংশের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছর। চার চাকার যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে দেশে গণপরিবহনব্যবস্থা উন্নত ও সহজলভ্য না হওয়া এবং যানজটের কারণে মানুষ মোটরসাইকেল ব্যবহারে উৎসাহিত হচ্ছেন। এর ফলে দুর্ঘটনাও বাড়ছে।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার না করার বিষয়টি উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। তাদের ভাষ্য, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার করলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৮ শতাংশ কমে।
দুর্ঘটনার ৯ কারণ
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পেছনে নয়টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো—কিশোর-তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, রাজনীতিতে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর সংস্কৃতি, ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ, সচেতনতামূলক কর্মসূচির অভাব, ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্বল সড়ক অবকাঠামো, প্রযুক্তির ব্যবহার ও নজরদারির অভাব, সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের ঘাটতি এবং অসহনীয় যানজট।
দুর্ঘটনা কমাতে ৮ সুপারিশ
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে আটটি সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এগুলো হলো—মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো এবং বিটিআরসির মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপত্তামূলক প্রচারণা চালানো।


