বাংলাদেশ সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম নয় দিনে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয় পেয়েছে, যা নীতিনির্ধারকদের আশা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর লক্ষ্যে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রবাসী আয়ের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক শূন্য ১৮ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ১২ হাজার ৪২০ কোটি টাকার সমান। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই পরিমাণ ১৮৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি, যা প্রবাসী কর্মীদের অর্থ প্রেরণে ধারাবাহিক বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
গত পাঁচ বছরে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা ২০২০ অর্থবছরে ১৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ অর্থবছরে ৩০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। গত অর্থবছরে মাসে প্রবাসী আয় গড়ে ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার ছিল। মার্চ ২০২৫ সালে রেকর্ড ৩ দশমিক ২৯ বিলিয়ন পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক এই শক্তিশালী প্রবাসী আয় প্রবাহের সুবিধা নিয়েছে। ১৩ জুলাই থেকে ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে, বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার কিনেছে, যা নিলাম তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে এক দিনে ৩১৩ মিলিয়ন ডলার ও ৯ সেপ্টেম্বর ২৬৫ মিলিয়ন ডলারের বড় লেনদেন হয়েছে। এসব ক্রয় রিজার্ভকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩০ দশমিক ৬৬ বিলিয়নে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে, যা জুলাই মাসে ছিল ২৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
এদিকে, টাকার মান গত কয়েক বছরে চাপের মধ্যে রয়েছে। ২০২২ সাল থেকে ডলারের বিপরীতে প্রায় ২৫ শতাংশ হারিয়েছে। একাধিক সমন্বয়ের পর, সরকারি বিনিময় হার বর্তমানে প্রতি ডলার ১২২ টাকার কাছাকাছি। তবে ব্যাংক এবং মানি চেঞ্জাররা প্রায়শই কিছু বেশি রেট দিচ্ছেন।
বিশ্লেষকরা জানান, প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে ফরমানি চ্যানেলে প্রবাহ বজায় রাখা ডলার অবমূল্যায়ন রোধ করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রবাসী আয় ছাড়াও, বাংলাদেশ সরকার অফিশিয়াল অর্থায়নের ওপর নির্ভর করছে। জুন মাসে আইএমএফ ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ মঞ্জুর করেছে, এবং এই প্রোগ্রামের আওতায় আরও দুইটি কিস্তি, যা প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বাকি রয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, এবং আইএফসি থেকে অতিরিক্ত বাজেট সহায়তা আগামী এক বছরে ১ দশমিক ৫ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার হতে পারে।
২০২৬ সালের জুনে ৪০ বিলিয়ন রিজার্ভ লক্ষ্য অর্জন করতে বাংলাদেশকে ১০ মাসে প্রায় ৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন যোগ করতে হবে, যা প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৮৭০ মিলিয়ন ডলার। জুলাই মধ্য থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ধারা অব্যাহত থাকলে রিজার্ভ ৩৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, তবে লক্ষ্য পূরণ হবে না।
আইএমএফের দুটি কিস্তি যোগ করলে, মাসিক যোগফল ৮০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, ফলে রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি আসবে। যদি বাংলাদেশ ব্যাংক তার মাসিক কেনার গতি ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়াতে পারে এবং পার্টনার ঋণ থেকে অন্তত ২ বিলিয়ন ডলার যোগ হয়, তবে রিজার্ভ লক্ষ্য ছুঁতে পারে, যা ৪১–৪২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
যদিও বাইরের পরিশোধ, বিশেষ করে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) প্রতি দুই মাসে ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন পরিশোধ রিজার্ভ থেকে সরিয়ে নেবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রবাসী আয়ের প্রবাহের সময় দ্রুত ডলার কেনা অব্যাহত রাখতে হবে। প্রতি মাসে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় বজায় রাখা এবং তার ৩০–৪০ শতাংশ সরকারি রিজার্ভে ধরে রাখা একান্ত জরুরি।
পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান এমডি মজেদুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশ ৪০ বিলিয়ন ডলার লক্ষ্য পূরণের কাছাকাছি অবস্থান করছে। কিন্তু এর জন্য শক্তিশালী প্রবাসী আয় প্রবাহ, শৃঙ্খলাপূর্ণ আমদানি, এবং সময়মত মাল্টিলেটারাল ঋণ প্রয়োজন হবে।’


