১৬ বছর দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন চলেছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম।
তিনি বলেন, ‘গত ১৬ বছর দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন চলেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ছাত্রলীগের মাধ্যমে “কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে” পরিণত করা হয়েছিল।’
বুধবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে আর সি মজুমদার অডিটোরিয়ামে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম-খুন, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা, ছাত্ররাজনীতির সুশাসন ও নতুন বাংলাদেশের মানবাধিকার কাঠামো নিয়ে আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ইসলাম চর্চা বা নামাজ পড়ার কারণে বহু শিক্ষার্থীকে শিবির সন্দেহে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন সাদিক কায়েম।
তিনি বলেন, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গুম–খুনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা যারা করে, তারা নতুন বাংলাদেশের মূল্যবোধের পরিপন্থী। নতুন বাংলাদেশ হবে অধিকার ও ন্যায়ভিত্তিক, যেখানে গুম ও টর্চারের স্থান থাকবে না।’
অনুষ্ঠানে বক্তারা গুম-খুনের অবসান, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মানবাধিকার সুরক্ষা, নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
পাশাপাশি গুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তারা।

জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মিশনপ্রধান হুমা খান বলেন, ‘মানবাধিকার কোনো জটিল ধারণা নয়; মানুষের ধর্ম, জাতি, শ্রেণি, লিঙ্গ বা বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য।’
মানবাধিকারকে পাশ্চাত্যের ধারণা মনে করা ভুল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মানবাধিকারমূল্য বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মীয় গ্রন্থে প্রতিফলিত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মানবাধিকার ধারণা ও প্রতিষ্ঠান দুটি আলাদা বিষয়। প্রতিষ্ঠানগুলো অপূর্ণাঙ্গ হলেও অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে।’
জনগণের অর্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়–এমন বোধ প্রতিষ্ঠায় তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বেগম রোকেয়া পদকপ্রাপ্ত ড. নাবিলা ইদ্রীস বলেন, ‘গুম-ভুক্তভোগীদের মানসিক ও শারীরিক অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ভয়াবহ।’ অনেককে ইলেকট্রিক শক দিয়ে স্বাভাবিক শিক্ষার ক্ষমতাও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত টর্চার ও গেস্টরুম সংস্কৃতির বিরোধিতা করে প্রতিটি ঘটনা নথিবদ্ধ করার আহ্বান জানান এবং পরিবর্তনের পথে নারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
আহমেদ বিন মীর কাশিম বলেন, ‘গুম-ভুক্তভোগী শত শত পরিবার আজও জানে না তাদের প্রিয়জন জীবিত নাকি মৃত। রাষ্ট্র তাদের সামনে কোনো জবাব হাজির করতে পারেনি।’ তিনি গুমকে জাতীয় ক্ষত উল্লেখ করে বলেন, এসব পরিবারের পুনর্বাসন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও গুম-ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তায় সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সাম্প্রতিক এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার দেশত্যাগের বিষয়ে তদন্ত না হওয়াকে তিনি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা আখ্যা দিয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রতি তদন্ত কমিশন গঠনের আহ্বান জানান।
জাতীয় গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, ‘অতীতে ছাত্র সংগঠনের নির্যাতনে শিক্ষার্থীদের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এসব পরিবর্তন করাই ডাকসুর দায়িত্ব।’
তিনি বলেন, ‘গুমের ঘটনাগুলো ভুলে গেলে চলবে না। প্রতিটি ঘটনার সত্য উদঘাটনে কমিশন কাজ করছে।’
রাজনৈতিক বিভাজন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো সহনশীলতা ও ভিন্নমতের প্রতি সম্মান।’
আলোচনা সভায় ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, ‘১৯৪৮ সালে মানবাধিকার দিবস পালনের সিদ্ধান্তের পরও বিশ্বের নানা অঞ্চলে যুদ্ধ-সংঘাত থামেনি।’ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, মধ্যপ্রাচ্য–সবখানেই সংঘাতের ধারাবাহিকতা রয়েছে, গাজা তার সাম্প্রতিক উদাহরণ।
তিনি বলেন, ‘দিবস এলে সভা-সেমিনার হয়, কিন্তু মানুষের জীবনরক্ষার মতো মৌলিক অধিকার এখনো নিশ্চিত হয় না।
৭১-এর পর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গত ১৫ বছর ছিল ভয়াবহ মানবাধিকার সংকটের সময় এবং ২০২৪-এর পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলায়নি।’


