সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ১২১ বারের মতো পিছিয়েছে।
রোববার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ থাকলেও তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) প্রতিবেদন দেয়নি। ফলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মিনহাজুর রহমান আগামী ৩০ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া করা বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও রুনি। সাগর তখন বেসরকারি টেলিভিশন মাছরাঙা টিভিতে এবং রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন।
এ ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলী রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার পর থেকে একযুগেও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়নি। এ পর্যন্ত আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পিছিয়েছে ১২১ বার। প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগামী ৩০ নভেম্বর এ মামলার পরবর্তী দিন ঠিক করা হয়েছে।
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্তের দায়িত্ব থেকে র্যাবকে বাদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করে ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এর তিন সপ্তাহ পর, ২৩ অক্টোবর সরকার এ টাস্কফোর্স গঠন করে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে বলা হয়, ছয় মাসের মধ্যে টাস্কফোর্স হাইকোর্টে প্রতিবেদন জমা দেবে এবং প্রয়োজনে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।
পরে গত ২২ এপ্রিল হাইকোর্ট টাস্কফোর্সকে আরও ছয় মাস সময় দেয়। বর্তমানে টাস্কফোর্সের অধীনে পিবিআই মামলার তদন্ত করছে।
২০১২ সালের সেই রাতে সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান, তখন পাঁচ বছরের মাহির সরওয়ার মেঘ বাসায় ছিল। পুলিশ জানিয়েছিল, খুনি ছিল দুজন। ঘটনার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এক যুগেও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি।
এ পর্যন্ত মামলায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে দুজন জামিন পেয়েছেন। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ছিলেন রুনির বন্ধু তানভীর রহমান, নিরাপত্তাকর্মী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবির, রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু, কামরুল হাসান অরুন, পলাশ রুদ্র পাল, তানভীর ও আবু সাঈদ।
প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করে। চার দিন পর দায়িত্ব দেওয়া হয় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি)। তারা রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হলে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টের নির্দেশে র্যাবের হাতে দায়িত্ব যায়। র্যাব ডিএনএসহ বিভিন্ন বায়োমেট্রিক পরীক্ষার জন্য ঘটনাস্থলের আলামত যুক্তরাষ্ট্রেও পাঠায়। কিন্তু এর ফলও প্রকাশ করা হয়নি।
তদন্ত প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় নিহত সাংবাদিক দম্পতির পরিবার ও সহকর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। দ্রুত ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন মহল।
এর আগে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বহুবার এই হত্যাকাণ্ডের কূলকিনারা করার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে অগ্রগতি হয়নি।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘এই বিচার করা না হলে আমরা জাতির কাছে দায়ী থাকব।’
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ গত ২১ সেপ্টেম্বর এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা দেখেছি চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে শতাধিকবার সময় নেওয়া হয়েছে। এটা কিছুতেই কাম্য হতে পারে না। তদন্ত কাজেই যদি একাধিক বছর সময় লেগে যায়, সে মামলার বিচারকাজ পরিচালনা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। সময়ের আবর্তে মামলার অনেক সাক্ষী ও সাক্ষ্য হারিয়ে যায়।’


