প্রায় ১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি এখন অযত্ন, অবহেলা আর অব্যবস্থাপনায় এক ভুতুড়ে স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। আধুনিক স্থাপত্যশৈলী ও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কার্যকর তদারকির অভাবে টার্মিনালটির ভেতরে এখন জং ধরা চেয়ার, খসে পড়া লাইট-ফ্যান আর সুনসান নীরবতার রাজত্ব। যাত্রীসেবার বদলে বর্তমানে টার্মিনালটি যেন একটি পরিত্যক্ত ভবনের রূপ নিয়েছে।
আসাম প্যাটার্নের দৃষ্টিনন্দন এই স্থাপনায় আগমন ও বহির্গমন টার্মিনাল, পাঁচতলা গোলাকার প্রশাসনিক টাওয়ার, আধুনিক কন্ট্রোল রুম, পুলিশ ও পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, রেস্টুরেন্ট, ফুড কোর্ট, ভিআইপি বিশ্রামাগার, ব্রেস্ট ফিডিং ও স্মোকিং জোনসহ নারী-পুরুষ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য আলাদা শৌচাগার ও নামাজের ব্যবস্থার মতো অত্যাধুনিক সুবিধা রয়েছে।
অথচ বর্তমানে এর দুই তলার ভিআইপি লাউঞ্জটি পরিবহন শ্রমিকদের বৈঠকখানা হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। পুরো ভবনের কাচের দেয়ালে টাঙানো রয়েছে পরিবহন শ্রমিকদের নির্বাচনী লিফলেট ও ব্যানার। এছাড়া যাত্রীদের জন্য ৯৭০ আসনের বিশাল হল ও ৩০টি টিকিট কাউন্টার থাকলেও ভবনের বিশাল অংশের ব্যবহার নেই বললেই চলে।
ঐতিহ্যবাহী কিন ব্রিজ ও আলী আমজাদের ঘড়ির আদলে গড়ে তোলা এই প্রকল্পটির কাজ ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের এমজিএসপি প্রকল্পের আওতায় শুরু হয়েছিল। প্রায় ৮ একর জমির ওপর ১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টার্মিনালের অবকাঠামো উন্নয়নে ৬১ কোটি এবং ডাম্পিং গ্রাউন্ডের জন্য ৫৬ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু এবং একই বছরের ১৫ নভেম্বর সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এর উদ্বোধন করেন। তবে নির্মাণে বিভিন্ন ত্রুটির অভিযোগ ওঠায় সমালোচনার মুখে পড়ে সিটি কর্পোরেশন এবং এরপর থেকে প্রকল্পটির তদারকিতে ভাটা পড়ে।
টার্মিনালটির বর্তমান বেহাল দশা সম্পর্কে সিলেট বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলাম বলেন, টার্মিনাল চালুর পর থেকে সিটি কর্পোরেশনের কোনো তদারকি নেই। ইজারাদাররাও তাদের দায়িত্ব সেভাবে পালন করছেন না, যার ফলে অনেক কিছু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে টার্মিনালটি পরিচালনার দায়িত্বে আছেন ইজারাদার মো. মিজানুল ইসলাম। তিনি গত বছরের ১ জুলাই থেকে এক বছরের জন্য ১ কোটি ৪৩ লক্ষ টাকায় টার্মিনালের যানবাহন ও কাউন্টার থেকে টোল আদায়ের ইজারা নিয়েছেন। তার আগে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট ৫৬ লাখ টাকায় এটি ইজারা নিয়েছিলেন সেলিম আহমদ নামে এক ব্যক্তি।
তবে ইজারাদারদের পক্ষ থেকে কোনো রক্ষণাবেক্ষণ দেখা না যাওয়ায় টার্মিনালের অব্যবস্থাপনা চরম আকার ধারণ করেছে। টার্মিনালে বাসের যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় আগের মতোই সড়কের অর্ধেকজুড়ে বাস রাখা হয়, যার ফলে যানজট পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
এই পরিস্থিতির দায় স্বীকার করে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবর বলেন, রক্ষণাবেক্ষণ যে হচ্ছে না তা ঠিক।
তিনি আরও বলেন, দুই বছর ধরে ধার করা প্রশাসন চলায় এমনটা হয়েছে। তবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দায়িত্ব গ্রহণ করলে ইজারাদার ও সিসিকের দায়িত্ব নির্ধারণ করে টার্মিনালের হারানো নান্দনিকতা অবশ্যই ফিরিয়ে আনা হবে।


