জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় শেখ হাসিনা ও সেনা কর্মকর্তাসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে ১৪ ডিসেম্বর আদেশ দেওয়ার দিন ধার্য করা হয়।
মঙ্গলবার বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দিন ধার্য করে।
গ্রেপ্তার হওয়া তিন সেনা কমকর্তা হলেন মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজহার সিদ্দিকী। শুনানির সময় তাদের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। তাদের বিষয়ে আইনজীবীদের যুক্তি ও বক্তব্য ছিল প্রায় একই।
শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষে অংশ নেন চিফ প্রসিকিউর তাজুল ইসলাম, মিজানুল ইসলাম ও শাইখ মাহদী। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু, মাহিন এম রহমান, মাসুদ সালাউদ্দিন ও আমির হোসেন।
পলাতক হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন শুনানি করেন।
এদিন, দুপুর ১২টায় চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনালের তিন সদস্য এজলাসে আসন গ্রহণ করেন। শুনানি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেন। এরপর চেয়ারম্যান ছাড়া বাকি দুই সদস্য এজলাসে আসেন। সেই দুই সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনালেই পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
শুনানিতে চিফ প্রসিকিউর বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া তিন সেনা কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। অভিযোগ গঠনের শুনানির সময়, অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদনের সুযোগই আইনে নেই।
তিন সেনা কর্মকর্তার পক্ষে আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে আটক, অপহরণ, আয়নাঘরে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে। ডিজিএফআইয়ের নয়টি ব্যুরোর মধ্যে কাউন্টার টেরোরিজম ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (সিটিআইবি) অন্যতম। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী যখন বন্দী হন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী তখন সিটিআইবির পরিচালক ছিলেন না।’
এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘উনি বলছেন, ওই সময় আসামি ওই পদে ছিলেন না। আমি বলেছি, ছিলেন। এর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ট্রায়াল (বিচার) প্রয়োজন। সেই সময় এখন নয়। এখন আসামিপক্ষের আবেদন পড়তে গেলে সারাদিনেও শেষ হবে না। উনি তো ট্রাইব্যুনাল আইনটাই বোঝেননি। অভিযোগ গঠনের শুনানির সময় প্রাইমাফেসি (অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা) দেখতে হবে। মামলার এ পর্যায়ে পুরো সাক্ষ্য, ডকুমেন্ট বিশ্লেষণ করার সুযোগ নেই।’
আইনজীবী দুলু গুম চলমান রাখার বিষয়ে অভিযোগের জবাব দেন। তিনি বলেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আযমী গুম অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে ঘটনায় ১১ জনকে দায়ী করে সেনাবাহিনীর কাছে একটি অভিযোগ দেয়। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সেনা আইনে গঠিত তদন্ত আদালতের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আযমীকে অপহরণের ঘটনায় আটজনকে দায়ী করে শাস্তি দেওয়া হয়। এই ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগে সেই আটজনের মধ্যে ছয়জন আসামি হলেও দুজনকে আসামি করা হয়নি। এর মানে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অসম্পূর্ণ।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মিজানুল বলেন, তদন্ত আদালতের রিপোর্ট মানা বাধ্যতামূলক নয়। তাজুল বলেন, আর্মির রিপোর্ট মানা বাধ্যতামূলক না। আর্মি তো তাদের বাঁচানোরও চেষ্টা করতে পারে। তদন্ত আদালতের যে ডকুমেন্টের ওপর ভিত্তি করে আসামিপক্ষের আইনজীবী কথা বলছেন, সেটি আদালতে হাজির করা হয়নি। এর ভিত্তিতে তিনি কথা বলেন কীভাবে?
দুলু বলেন, ‘যারা আযমীর গুম চলমান রেখেছেন, সেই রিপোর্টে তাদের নাম আছে। তবে, আমার মক্কেলের নাম নেই।’
উত্তরে ট্রাইব্যুনাল বলে, ‘জেআইসিতে আপনার মক্কেলের কন্ট্রোল ছিল। সেখানে আপনি জড়িত কি না, তা কি আমরা এখন বলতে পারি?’
আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তদন্ত আদালতের সেই রিপোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে হাজির করতে পারেননি। সেই রিপোর্টের অংশবিশেষ হুবহু তুলে এনে তারা আদালতে অব্যাহতির আবেদন করেছেন।


