অস্ট্রেলিয়া সফরের পর কেন্টে ফিরে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে সাত উইকেট নিয়েছেন হাসান মাহমুদ। বোলিং কোচ তারেক আজিজ খানের মতে, নিজের সামর্থ্যের আরও ৩০ শতাংশ এখনো দেখানো বাকি তার।
অস্ট্রেলিয়ার স্মরণীয় সফর শেষ করে কেন্টে ফিরে যেন সেখান থেকে শুরু করলেন হাসান মাহমুদ, যেখানে শেষ করেছিলেন। কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে উরস্টারশায়ারের বিপক্ষে সাত উইকেট নিয়েছেন বাংলাদেশের এই পেসার। প্রথম ইনিংসে ৬৮ রানে ৪ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৫১ রানে ৩ উইকেট নেন তিনি।
সাতটি উইকেটের প্রতিটি এসেছে বোল্ড অথবা এলবিডব্লিউতে। তিন ব্যাটার বোল্ড হয়েছেন এবং চারজন হয়েছেন এলবিডব্লিউ। ডানহাতি ব্যাটারদের জন্য বল ভেতরে আনছিলেন হাসান, অফ স্টাম্পের আশপাশে বল রেখে নিয়মিত উইকেটের সুযোগ তৈরি করছিলেন।
কেন্টের হয়ে হাসানের ছয় ইনিংসের বোলিং ফিগার হলো–৩২ রানে ৩, ৬৯ রানে ৬, ৭৭ রানে ২, ৫১ রানে ১, ৬৮ রানে ৪ এবং ৫১ রানে ৩ উইকেট। তিন ম্যাচে ১৮.৩২ গড়ে তার মোট উইকেট ১৯টি।
কেন্টের হয়ে হাসানের প্রথম সময়টা ছিল বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে। দুই ম্যাচে ১২ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। এর মধ্যে ল্যাঙ্কাশায়ারের বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারসেরা ৬৯ রানে ৬ উইকেটও ছিল।
এরপর আসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ। ডারউইন টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৫৫ রানে ৬ উইকেট এবং ম্যাচে মোট ১১১ রানে ৯ উইকেট নেন হাসান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নয় উইকেটের জয়ে বাংলাদেশ সিরিজের ওই টেস্ট জেতে, যেখানে ম্যাচসেরার পুরস্কার পান হাসান।
হাসান বল দুই দিকে সুইং করাতে পারেন। বিশেষ করে ডানহাতি ব্যাটারদের জন্য ভেতরে আসা ডেলিভারিগুলো বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল, কারণ তিনি সঠিক জায়গায় বল ফেলছিলেন।
সাবলীল অ্যাকশনে অফ স্টাম্পের আশপাশে বল পিচ করিয়ে দ্রুত ভেতরে ঢোকাতে পারেন হাসান। আবার বল বাইরের দিকেও শেপ করান তিনি। বাইরের দিকে যাওয়া কয়েকটি বল ব্যাটারকে আউটসাইড এজের ব্যাপারে আরও সতর্ক করে তোলে।
তবে তার সাফল্য শুধু সুইং বা মুভমেন্টের ওপর নির্ভর করে আসেনি। একই অ্যাকশন ধরে রাখা, সিমে বল ফেলা এবং সঠিক জায়গায় নিয়মিত বল করার ধারাবাহিকতাও এতে ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের সাবেক ফাস্ট বোলার হাসিবুল হোসেন শান্ত দীর্ঘদিন ধরে হাসানের মধ্যে এসব বিষয় লক্ষ্য করছেন।
টাইমস অব বাংলাদেশকে হাসিবুল বলেন, ‘অনূর্ধ্ব-১৫ বা অনূর্ধ্ব-১৬ পর্যায় থেকে আমি হাসানকে দেখছি। ও দিনে দিনে উন্নতি করেছে এবং আজকের এই পর্যায়ে আসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে।’
‘হাসান নিজের সীমাবদ্ধতা জেনে বোলিং করে এবং সে কারণে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে এত ভালো করছে। সে বাড়তি কিছু করার চেষ্টা করে না, নিজের বেসিকগুলো ঠিক রাখে।’
কাউন্টি ক্রিকেট হাসানকে এমন একটি পরিবেশ দিয়েছে, যেখানে তার বেসিকের পরীক্ষা নিয়মিত হচ্ছে। সেখানকার ব্যাটাররা সিম ও সুইং সামলাতে অভ্যস্ত এবং পরিবেশও দ্রুত বদলাতে পারে। একজন পেসারকে টানা স্পেলে লাইন ও লেংথ বজায় রেখে সুযোগ তৈরির পথ খুঁজতে হয়।
হাসিবুল মনে করেন, এমন পরিবেশে নিয়মিত পারফর্ম করা হাসানকে আরও উন্নত বোলারে পরিণত করবে।
তিনি বলেন, ‘কোনো বোলার যদি কাউন্টি ক্রিকেটে নিয়মিত পারফর্ম করে, তবে সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্নত হয়। সেখানে বেসিক ঠিক না রেখে ভালো করা সম্ভব নয়। অস্ট্রেলিয়ায় হাসানের মধ্যে এই সক্ষমতা দেখা গেছে।’
বোলিং কোচ তারেক আজিজ খান হাসানের উন্নতির আরেকটি দিক লক্ষ্য করেছেন। বিসিবির বাংলা টাইগার্স ক্যাম্পে বাংলাদেশের এই সাবেক ফাস্ট বোলার তাকে কোচিং করিয়েছেন। তারেকের মতে, হাসানের সাবলীল রান-আপ ও কারিগরি সমন্বয় তার বোলিংয়ের নির্ভুলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তারেক টাইমসকে বলেন, ‘বাংলা টাইগার্স ক্যাম্পে আমি তার কোচ ছিলাম। আমার মনে হয় গত দুই-তিন বছর ধরে সে দারুণ ছন্দে আছে। উপমহাদেশের বাইরে তার পারফরম্যান্স বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।’
‘তার সবচেয়ে ভালো দিক হলো অত্যন্ত সাবলীল রান-আপ। নির্ভুলতা অর্জনের জন্য যে কারিগরি সমন্বয় প্রয়োজন, সে তা করেছে। সে নিজের যত্ন নেয় এবং নিজের খেলাটা উপভোগ করছে।’
বাংলাদেশের যেকোনো ফাস্ট বোলারের জন্য উপমহাদেশের বাইরে পারফর্ম করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে হাসান যা করে দেখাচ্ছেন, তার পরও তারেক মনে করেন বাংলাদেশ এখনো তার পূর্ণ সামর্থ্য দেখেনি।
তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি হাসান এ পর্যন্ত তার ৭০ শতাংশ দিতে পেরেছে। আমি মনে করি তার এখনও ৩০ শতাংশ দেওয়া বাকি আছে।’
‘আমার মনে হয় সে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম মূল্যবান রত্ন হতে যাচ্ছে। চার-পাঁচ বছর ধরে তাকে যেভাবে দেখছি, আমার সত্যিই মনে হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটকে আরও অনেক কিছু দেওয়ার সামর্থ্য তার রয়েছে।’
২৬ বছর বয়সে সময় হাসানের পক্ষে রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, যেসব পরিবেশ একজন ফাস্ট বোলারকে বিভিন্নভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে, সেসব জায়গা থেকে তিনি অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। তারেক বিশ্বাস করেন, এই অভিজ্ঞতাই ব্যবধান গড়ে দেবে।
তিনি বলেন, ‘কেন্ট এবং বাংলাদেশের টেস্ট ম্যাচের মতো অ্যাওয়ে ম্যাচগুলো তাকে আত্মবিশ্বাস দেবে। ভবিষ্যতে তার কাছ থেকে আপনারা আরও ভালো পারফরম্যান্স আশা করতে পারেন।’


