ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই সংকটের ফলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের টান পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের সংযোগকারী এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়েই বাংলাদেশের প্রায় সব অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করা হয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ-করিডোরটিতে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা বজায় থাকলে দেশের সদ্য ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করা অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ এবং এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ এই রুট দিয়ে সম্পন্ন হয়। উপসাগরীয় দেশগুলো, যারা বৈশ্বিক তেল মজুতের অর্ধেক এবং গ্যাস মজুতের ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তারা এই করিডোরের ওপর নির্ভরশীল। এই অচলাবস্থার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে এশীয় দেশগুলোর ওপর। কারণ, উপসাগরীয় দেশগুলোর রপ্তানিকৃত জ্বালানির ৮০ শতাংশই কেনে এসব দেশ।
বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার জন্য মূলত সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমানের ওপর নির্ভরশীল। চট্টগ্রাম অভিমুখী প্রায় সব জাহাজকেই বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের আগে এই হরমুজ প্রণালী পার হতে হয়।
বাংলাদেশ ওশান গোয়িং শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের তেল ও গ্যাস আমদানির প্রায় শতভাগই হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। তিনি সতর্ক করে দিয়ে জানান, এই পথ বন্ধ থাকলে আমাদের বিকল্প দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হবে অথবা দীর্ঘতর সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে হবে। উভয় ক্ষেত্রেই খরচ বাড়বে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দামের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে।
শিপিং খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, লোহিত সাগর বা আরব সাগরের দীর্ঘ পথ দিয়ে জাহাজ ঘুরিয়ে আনলে বর্তমানের ১৫ থেকে ২৫ দিনের যাতায়াত সময় বেড়ে ৪৫ দিন পর্যন্ত হতে পারে। এর ফলে জাহাজ ভাড়া বা ফ্রেইট চার্জ ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে, বিমা প্রিমিয়ামও কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি শফিকুল আলম জুয়েল জানান, শুধুমাত্র ট্রানজিট সময় বেড়ে যাওয়ার কারণেই চার্টার খরচ এবং সামগ্রিক পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
এই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) রোববার ঢাকায় এক জরুরি বৈঠক করেছে। বৈঠকে সরবরাহ ঝুঁকি এবং আপদকালীন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। বিপিসি’র সচিব শাহিনা সুলতানা জানান, বর্তমানে দেশে ৩৫ থেকে ৪০ দিনের ব্যবহার উপযোগী প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টন পেট্রোলিয়াম পণ্যের মজুত রয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে বিপিসি’র পরিকল্পনাও আছে।
স্বস্তির খবর হলো, এক লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেলবাহী একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার আগেই সেই পথ অতিক্রম করেছে এবং তা সময়মতো দেশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে চলতি মাসের শেষের দিকে আসার কথা থাকা পরবর্তী চালানগুলো নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
বাংলাদেশ প্রতি বছর সরকারি পর্যায়ে চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব এবং আবুধাবি থেকে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। দেশে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও ফার্নেস অয়েলসহ সব ধরনের জ্বালানির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭২ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে ডিজেলের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, এই উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি উচ্চমূল্যের কারণে বাংলাদেশ দ্বিমুখী সংকটে পড়বে।
তিনি বলেন, আমদানি বিল বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে যদি রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যায়, তবে মূল্যস্ফীতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। এতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ঝুঁকিতে পড়বে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, উৎপাদন খাত, পরিবহন ও কৃষিতে জ্বালানির উচ্চমূল্যের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।
সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি শহিদুল ইসলাম মনে করেন, এই সংকটের মাত্রা নির্ভর করছে সংঘাতের স্থায়িত্ব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে কি না তার ওপর।
বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের পুঁজিবাজারেও পড়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স রোববার ৪ শতাংশ কমে লেনদেন শুরু করলেও দিনশেষে তা ২ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৪৬১ পয়েন্টে দাঁড়ায়। ৩৫৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমলেও বেড়েছে মাত্র ৩০টির।
শহিদুল ইসলাম বাজারের এই প্রতিক্রিয়াকে কিছুটা আবেগপ্রসূত বললেও অস্থিরতার ঝুঁকিকে অস্বীকার করেননি।
বিশ্লেষকরা রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়ে ও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক। সেখানে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বা আয় কমে গেলে রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, এই ধাক্কা শুধু জ্বালানি সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমদানিকৃত পণ্যের খরচ বাড়লে বিদ্যুৎ ও পরিবহনের ভাড়া বাড়বে এবং খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে ২০২২ সালের ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে চলমান অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে শুরু করা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এই অচলাবস্থা কতদিন স্থায়ী হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ।


