রাঙ্গামাটি জেলায় সম্প্রতি পোষা কুকুর চুরির ঘটনায় মালিকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র মাংস হিসাবে খাওয়ার জন্য স্থানীয়দের পোষা ও বেওয়ারিশ কুকুর ধরে সীমান্ত দিয়ে ভারতের মিজোরামে পাচার করে দিচ্ছে।
ভারতের নাগাল্যান্ডে কুকুরের মাংস বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া মিজোরামেও উৎসব-পার্বনে কুকুরের মাংষ খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড চললেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী কুকুরপ্রেমীরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাঙ্গামাটি জেলা ও ভারতের মিজোরামের একটি যৌথ চক্র প্রতি বছর রাঙ্গামাটি থেকে হাজার হাজার কুকুর সংগ্রহ করে সীমান্ত পার করে দেয়। ওপারে প্রতিটি কুকুর ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
পাচারকারীরা মূলত নৌপথে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে বিভিন্ন এলাকায় হানা দেয়। চক্রটির দাবি, তারা কেবল বেওয়ারিশ কুকুর ধরে থাকে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সুযোগ পেলেই তারা মানুষের পোষা কুকুরও তুলে নিয়ে যায়।
সম্প্রতি লংগদু উপজেলার বাট্টাপাড়ায় দড়িযুক্ত বিশেষ লাঠি দিয়ে কায়দা করে কুকুর ধরার দৃশ্য দেখা গেছে। বাধা দিয়েও এই চক্রটিকে থামানো যাচ্ছে না বলে স্থানীয়দের দাবি।
খাওয়ার জন্য কুকুর পাচার
ভারতের মিজোরাম অঞ্চলে মিজুদের ‘বসন্ত উৎসব’সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কুকুরের মাংস খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। এছাড়া নাগাল্যান্ডেও কুকুরের মাংস বেশ জনপ্রিয়। বাংলাদেশে কেউ কুকুরের মাংস খায় না। এই সুযোগে এখানকার একটি অসাধু চক্র মিজোরামের পাচারকারীদের সাথে হাত মিলিয়ে এই ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। তিন পার্বত্য জেলা থেকে কুকুর সংগ্রহ করে তারা সীমান্ত পার করে দেয়, যা ওপারে চড়া দামে বিক্রি হয়।
কুকুর মালিকদের অভিযোগ ও আতঙ্ক
রাঙ্গামাটি শহরের বনরূপা এলাকার বাসিন্দা রহিত চাকমা বর্তমানে নিজের পোষা কুকুর হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি জানান, ২০২০ এবং ২০২১ সালে তার দুটি কুকুর চুরি হয়ে যায়, যা অনেক খুঁজেও পাওয়া যায়নি।
রহিত বলেন, ‘মিজোরামে খাওয়ার জন্যই আমাদের দেশের এক শ্রেণির মানুষের সহায়তায় এই পাচারকাজ চলছে। আমরা অনেক আগে থেকেই এই আতঙ্কে আছি।’
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান রাঙ্গামাটি শহরের জিনা চাকমা। ২০২১ সালে তার কুকুরটি হারিয়ে গেলে পাহাড়ি-বাঙালি মিলে শহরের রিজার্ভ বাজারে পাচারকারী চক্রটিকে ধাওয়া করে কুকুরটি উদ্ধার করা হয়।
জিনা চাকমার অভিযোগ, প্রতি বছর ভারত থেকে কুকি সম্প্রদায়ের মানুষ এ দেশে এসে কুকুর ধরে নিয়ে যায়। যারা কুকুর ভালোবাসেন, তাদের এখন অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রশাসনকেও দ্রুত তৎপর হতে হবে।
লংগদুর শফিক ইসলাম জানান, সম্প্রতি তার কুকুরটিকেও একদল লোক বিশেষ লাঠি দিয়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। খবর পেয়ে তিনি দ্রুত সেখানে গিয়ে ঝগড়া করে কোনোমতে নিজের কুকুরটিকে উদ্ধার করেন। তবে সবাই তার মতো ভাগ্যবান নন।
প্রশাসনের বক্তব্য
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি লংগদু উপজেলার বাট্টাপাড়া এলাকায় ২০ থেকে ৩০টি কুকুর ট্রলারে করে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তবে এ বিষয়ে রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নামজা আশরাফী জানান, কোথায় বেআইনিভাবে কুকুর ধরা হচ্ছে বা পাচার হচ্ছে সে বিষয়ে তিনি অবগত নন। তিনি এ বিষয়ে রাঙ্গামাটি পৌরসভা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে, রাঙ্গামাটি জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ডা. মইনুল ইসলাম চৌধুরী জানান, লংগদুতে অবৈধভাবে কুকুর ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানার পরপরই তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে যাতে কেউ এ ধরনের বেআইনি কাজ করতে না পারে সেবিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


