হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার সুনারু গ্রামের কৃষক মহাদেব দাস। প্রতি বিঘা ৮ হাজার টাকা চুক্তিতে ১৯ বিঘা জমি বর্গা চাষ করেন তিনি। এতে তার খরচ হয়েছে আড়াই লাখ টাকা। তবে মাত্র ২ বিঘা জমির ফসল কাটতে পারলেও বাকি সব জমি পড়ে আকস্মিক বন্যার কবলে।
মহাদেব দাস জানান, যে ২ বিঘা জমির ফসল তিনি কেটে খলায় রেখেছিলেন সেগুলোও রোদের অভাবে পচে নষ্ট হচ্ছে। এ বছর তার বর্গা চাষ করা ১৯ বিঘা জমির ফসল পুরোটাই জলে গেছে। এতে চরম লোকসানে পড়ে দেনা পরিশোধে এখন হিমশিম খাচ্ছেন।
একই অবস্থা জেলার আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই, নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলার ২১ হাজার কৃষকের। বন্যার কবলে পড়ে প্রতিনিয়ত ভারী হচ্ছে ক্ষতচিহ্ন। কষ্টের ফসল হারিয়ে দিশেহারা তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী জেলার বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই ও বাহুবল উপজেলার নিম্নাঞ্চল এলাকার হাওরের প্রায় সাড়ে ১১ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক জমির ধান পানির নিচে নষ্ট হচ্ছে। কোথাও কোথাও আংশিক ক্ষতি হয়েছে। কিছু ধান রোদের অভাবে পচে নষ্ট হচ্ছে।
তবে হাওরের ৬২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বলে কৃষি অফিস দাবী করলেও বাস্তবে তা ভিন্ন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বলছেন, ৩০ শতাংশ জমির ফসল কাটা অবস্থায় আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এতে তলিয়ে যায় নিম্নাঞ্চলের জমি। টানা বৃষ্টি ও উজানের পানি নেমে আসার ফলে প্রতিদিন ডুবছে জমির ফসল। প্রতিনিয়ত হাওর এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
বর্তমানে বানিয়াচং উপজেলার আতুকুড়া এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকার উচু জমিও পানিতে তলিয়ে গেছে। বাহুবল উপজেলার গুঙ্গিয়াজুরি হাওরের অধিকাংশ জমির এখন পানির নিচে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন বাহুবল উপজেলার কাজীহাটা, তারাপাশা ও হাজীপুর এবং হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সুলতানশী, শরীফপুর, চানপুর, পাচ পাড়িয়া, শিয়াল দাড়িয়ার অনেক কৃষক।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার শরীফপুর গ্রামের কৃষক ময়না মিয়া বলেন, আগেই পানির নিচে গেছে ভাটি এলাকার জমি। এখন এলাকার উচু জমিগুলোও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।
‘সোনার ফসল আমরা ঘরে তুলতে না পারলে কিভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে সংসার চালামু’- শূন্য দৃষ্টিতে প্রশ্ন করেন ময়না মিয়া।
বানিয়াচং উপজেলার কাবিলপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল বারিক বলেন ‘তিন বিঘা জমি চাষ করেছিলাম। এক বিঘা কাটতে পারলেও দুই জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। যে ধান কেটেছিলাম তাও টানা বৃষ্টির কারণে খলাতেই পচে গেচে।’
আজমিরীগঞ্জ উপজেলার শিবপাশার কৃষক সেন্টু মিয়া বলেন, ‘শুধু ২ বিঘা জমির ধান কাটতে পেরেছিলাম। এর পরপরই বন্যা দেখা দেয়। এখন আমাদের আরও ৪ বিঘা জমি পানির নিচে। এগুলো কাটতে গিয়ে প্রতিদিন বুক পানিতে নামতে হচ্ছে।’
কৃষকরা বলছেন, নিয়মিত রোদ দেখা না দিলে কাটা ধান সবটুকু পচে নষ্ট হয়ে যাবে। জমি থেকে পানি দ্রুত না নামলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক দীপক কুমার পাল জানান, সব মিলিয়ে হবিগঞ্জ জেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৪০ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। প্রস্তুত করা হয়েছে ২১ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা। সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।


