জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর ধানমন্ডি-২৭ এলাকায় সাহেদ আলী আহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ১১৩ জনের অব্যাহতির সুপারিশ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ বিষয়ে সম্প্রতি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল বাশার জানান, মামলাটির পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য রয়েছে।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর সীমান্ত স্কয়ার এলাকা থেকে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে ধানমন্ডি-২৭ এলাকায় আহত হন সাহেদ আলী।
এ সময় ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ মোট নয়জন আহত হওয়ার কথা এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় সাহেদের কথিত ভাই শরীফ বাদী হয়ে শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনকে আসামি করে ধানমন্ডি থানায় মামলা করেন।
পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে চারজনকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন শাকিল হোসেন ইমরান, কামরুল হাসান ওরফে কামু, মারুফ হোসেন ও মাসুদ রানা বেপারী।
পরে মামলার তদন্তভার পিবিআইয়ের কাছে দেওয়া হয়। পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর শাহজাহান ভূঞাঁ তদন্তকালে মামলায় উল্লেখিত আহত ব্যক্তিদের কোনো সন্ধান পাননি। ফলে তথ্যগত অসঙ্গতি ও প্রমাণের ঘাটতির কথা উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাসহ সব আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
মামলায় উল্লেখ অন্যান্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত, সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও ফেরদৌস আহমেদ, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
তদন্ত কর্মকর্তা শাহজাহান ভূঞাঁ জানান, জুলাই আন্দোলনে আহতদের একটি সরকারি গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু মামলায় যাদের আহত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের নাম ওই গেজেটে পাওয়া যায়নি। এ কারণে আপাতত আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি আহতদের তথ্য পাওয়া যায়, তখন পুনরায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
পিবিআইয়ের তদন্ত অনুযায়ী, বাদী শরীফের ঠিকানা ও পরিচয় যাচাই করতে গিয়ে নানা অসঙ্গতি পাওয়া যায়। হাজারীবাগে উল্লেখিত ভাড়া বাসায় নোটিশ পাঠানো হলেও বাড়িওয়ালা জানান, শরীফ নামে সেখানে কেউ থাকেন না।
তবে বাদীর জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে জানা যায়, বাদীর প্রকৃত নাম শরিফুল ইসলাম। তিনি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মান্দারী এলাকার বাসিন্দা হলেও স্থানীয়দের কেউ তাকে চিনতে পারেননি। তার মোবাইল ফোন নম্বরও অধিকাংশ সময় বন্ধ পাওয়া যায়।
পরে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের মাধ্যমে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে শরীফ একবার দেখা করলেও আহত ভুক্তভোগীকে হাজির করা বা চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র সরবরাহ করা হয়নি। এজাহারেও কোনো চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ ছিল না।
এ ছাড়া, গত বছরের ২৩ জানুয়ারি তদন্ত কর্মকর্তা হোয়াটসঅ্যাপে শরীফকে পরদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত, জখমি ও সাক্ষীদের উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানালেও তারা কেউই উপস্থিত হননি। পরে সাহেদ আলীকেও বিভিন্নভাবে খুঁজে পাননি তিনি।
বাদী এজাহারে উল্লেখ করেন, ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীও আহত হন। তবে পর্যাপ্ত তথ্য, পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা, ক্লাশ রোল না থাকায় কলেজে খুঁজেও তাদের তথ্য পাননি তদন্ত কর্মকর্তা। তদন্ত কর্মকর্তা আশপাশের হাসপাতালেও খবর নেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, শরীফের উল্লেখিত নামে কেউ হাসপাতালে ভর্তি হয়নি বা চিকিৎসা নেননি।
এ ছাড়া এজাহারে আহত হিসেবে উল্লেখিত সাহেদ আলীসহ রাশেদ, জুয়েল, মাহমুদ, নাহিদ, রাসেল, মিরাজ, জান্নাতুল ফেরদৌস নাঈমা, আইশ আক্তার ও সাম্মি আক্তারের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। আশপাশের হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রেও তাদের চিকিৎসা নেওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় আহতদের অস্তিত্ব ও চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যের কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় মামলাটিতে শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।


