আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে এ প্রস্তাব দেন তিনি।
দেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের সংস্কার ও পরিবর্তনের রূপরেখা ঘোষণায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এই নতুন দূরদর্শী লক্ষ্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
বাজেট উপস্থাপনের বক্তৃতায় বিগত শাসনব্যবস্থার অনিয়ম ও দুর্নীতির তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, দক্ষ জনবল নিয়োগ, পুষ্টির উন্নয়ন এবং দেশীয় ঔষধ ও সরঞ্জাম শিল্পের বিকাশে একগুচ্ছ নতুন ও কার্যকর পরিকল্পনার কথা জানান আমির খসরু।
তিনি বলেন, ‘আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি, যা জিডিপির ১ দশমিক ০১ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ।’
সীমিত আয়ের মানুষের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা কমানো, মানসম্মত ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই জনমুখী বাজেটের মূল লক্ষ্য বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর দশার জন্য পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থাকে দায়ী করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনই টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের পূর্বশর্ত। ফ্যাসিবাদী সময়ে স্বাস্থ্য খাতে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও উপকরণ কিনতে যে পরিমাণ ব্যয় হয়েছে, তার একটি বড় অংশই দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট করা হয়েছে, তাই স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন হয়নি। সে কারণে, বর্তমানে দেশের হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে, সাধারণ মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, আর বিপুল সংখ্যক রোগী বিদেশমুখী হওয়ায় মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি জানান এই সংকট থেকে উত্তরণে বিএনপি সরকার নতুন স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করেছে, যার মূল উদ্দেশ্য- সর্বজনীন ও ন্যায়সংগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, চিকিৎসা-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে প্রতিরোধ-কেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রূপান্তর, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও টিকাদান জোরদারকরণ এবং আধুনিক স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও চিকিৎসা শিল্পের বিকাশ ঘটানো।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ পর্যায়ক্রমে ও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি করে জিডিপির পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং এরইমধ্যে তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় দেশের প্রত্যেক নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের অধীনে একটি করে আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়া হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
এ ছাড়া জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য ও সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে প্রতিটি জেলা হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে জানিয়ে আমির খসরু বলেন, ‘এই নতুন ব্যবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে।’
অন্যদিকে সার্জারিসহ জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা যেমন- করোনারি কেয়ার, কিডনি ডায়ালাইসিস ইত্যাদি জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীভূত করা হবে বলেও জানান তিনি। একইসঙ্গে তিনি জানান, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগী পরিবহনের দুর্দশা লাঘবের জন্য একটি আধুনিক ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক’ গঠন করা হবে।
জনস্বাস্থ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি প্রণয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের খর্বাকৃতি মোকাবিলায় সরকার বহুমুখী ও বহু-খাতভিত্তিক একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে।
টিকাদান কর্মসূচিতে বিগত সরকারের অবহেলার কারণে দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাকে অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে, বিগত সরকারগুলোর টিকা সংগ্রহ ও টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়নে অবহেলা ও যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে দেশজুড়ে হাম-এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং শিশু মৃত্যুর মতো হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই প্রায় শতভাগ শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা প্রদান করছে।’
এই ধারা বজায় রাখতে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যেন সময়মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও ভ্যাকসিন পৌঁছানো যায়, সেজন্য দেশব্যাপী একটি টেকসই ও আধুনিক ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ঘোষণা দেন তিনি।
চিকিৎসা শিক্ষাকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে এবং স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকট দূরীকরণে বড় ধরণের সংস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবারের বাজেটে।
চিকিৎসা শিক্ষায় ইন্টিগ্রেটেড মডিউলার পদ্ধতি, আধুনিক ক্লিনিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা এবং এআই ভিত্তিক চিকিৎসা জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক, দক্ষতা-ভিত্তিক ও ভবিষ্যতমুখী নতুন এমবিবিএস কারিকুলাম চালু করা হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে অবিলম্বে পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে দেশব্যাপী মানসম্মত ও জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী।
নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতে উচ্চশিক্ষা, পেশাগত উন্নয়ন এবং ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘স্থানীয় ও বৈদেশিক বাজারের চাহিদা পূরণের মাধ্যমে শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতিদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ৪ মাস মেয়াদি “জেনারেল কেয়ারগিভার” প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও চালু করেছে সরকার।’
দেশীয় ঔষধ ও সরঞ্জাম শিল্পের বিকাশে সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে ঔষধ শিল্পের ধারাবাহিক বিকাশ, উদ্ভাবন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে আমাদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রণোদনা ও সহায়ক নীতিগত সুবিধা দেওয়া হবে।
এ লক্ষ্যে এপিআই শিল্প পার্কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, গবেষণা ও বিনিয়োগে নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখা হবে। এছাড়া সরকার চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মেডিকেল ডিভাইস উৎপাদন শিল্পকে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্পখাত হিসেবে উন্নয়নের বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।


