সরাসরি জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে এবং নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনলাইন মনোনয়ন জমা পদ্ধতি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর ফলে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী কমিশনের চালু করা ডিজিটাল কাঠামো থেকে সরে এসে আগের মতো সরাসরি সশরীরে মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার সনাতন পদ্ধতিতে ফিরে যাচ্ছে বর্তমান কমিশন।
নতুন নীতি অনুযায়ী, প্রার্থী বা তাদের মনোনীত প্রতিনিধিকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে।
ইসি সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ নিশ্চিত করতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ ছাড়া কর্মকর্তারা নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন।
তাদের মতে, অনলাইন পোর্টাল চালু থাকলে নিষিদ্ধ বা বিতর্কিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা দেশ বা বিদেশ থেকে মনোনয়ন জমা দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে, যা পরবর্তীতে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
ইসি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় নির্বাচনেও অনলাইন সুবিধা বাতিলের এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে এই পদক্ষেপ জরুরি। পূর্ববর্তী কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অনলাইন মনোনয়ন ব্যবস্থা চালু করেছিল।
সে সময় এই ব্যবস্থা চালুর উদ্দেশ্য ছিল প্রক্রিয়াটিকে সহজ করা, প্রার্থীদের বাধাদান রোধ করা এবং আচরণবিধি লঙ্ঘন কমানো।
বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে সংঘর্ষ, মহড়া এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমাদানে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঠেকানোর জন্য এই ডিজিটাল ব্যবস্থা ডিজাইন করা হয়েছিল।
তবে বর্তমান কমিশন মনে করে, স্থানীয় নির্বাচনের জন্য সশরীরে উপস্থিতি অপরিহার্য। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় যেকোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা কঠোরভাবে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে তারা বিশ্বাস করেন।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরাসরি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই কমিশন ডিজিটাল প্রক্রিয়ার চেয়ে প্রার্থী, তাদের প্রস্তাবক বা সমর্থকদের সরাসরি অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
প্রার্থীদের হয়রানির আশঙ্কার বিষয়ে তিনি আশ্বস্ত করেন, মনোনয়নপত্র জমাদানে কেউ বাধা সৃষ্টি করলে কমিশন তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং কমিশন একটি সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রবাসীদের অনলাইনে ফরম জমা দেওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, স্থানীয় প্রতিনিধিদের অবশ্যই ভোটারদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখতে হবে। ফলে ঢাকা বা বিদেশ থেকে অনলাইনে ফরম পাঠানোর সুযোগ নেই। প্রার্থী, প্রস্তাবক বা সমর্থকের মধ্যে যেকোনো একজনকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে।
কেউ উপস্থিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী নন বলে ধরে নেওয়া হবে। মাসুদ আরও যোগ করেন, কমিশন দরপত্র (টেন্ডার) জমা দেওয়ার মতো নির্বাচনী সংস্কৃতির বিরোধী। সশরীরে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শর্ত মেনে চললে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত পরিচয় নির্বিশেষে যোগ্য যেকোনো ব্যক্তি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।
তবে নির্বাচন বিশ্লেষকরা এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে সব ধরনের মনোনয়নের জন্য অনলাইন জমা পদ্ধতি বহাল রাখা উচিত।
তিনি যুক্তি দেন, ডিজিটাল জমা ব্যবস্থা চালু থাকলে প্রার্থী হয়রানির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় মাঠপর্যায়ে পেশীশক্তি প্রদর্শনের সুযোগ বন্ধ হবে।
এ ছাড়া অনলাইন ব্যবস্থা থাকলে কোনো প্রার্থীকে সশরীরে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।


