বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে কয়েক দিন হলো। তিন আয়োজক দেশ মেক্সিকো, কানাডা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেশ ভালো পারফরম্যান্স দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেছে। স্টেডিয়ামগুলোও দর্শকদের চিৎকারে মুখর ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোথাও যেন একটা খামতি ছিল। বিশ্বকাপ মানেই যে এক বিশাল ও অনন্য উৎসবের আমেজ, যা টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আসল জানান দেয়, এত দিন তা ছিল একেবারেই অনুপস্থিত।
এরপর শনিবার এলো এবং মাঠে নামল ব্রাজিল।
নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের চারপাশ মুহূর্তের মধ্যে যেন ক্যানারি হলুদ আর সবুজের সমুদ্রে পরিণত হলো। ইস্ট রাদারফোর্ডে জড়ো হয়েছিলেন বিশ্বের আনাচ-কানাচ থেকে হাজার হাজার ব্রাজিলিয়ান সমর্থক। তারা চারপাশের রাস্তা, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা এবং চত্বরগুলোকে সাম্বার সুরে মুখরিত এক বিশাল উৎসবের ময়দানে রূপান্তর করলেন। হঠাৎ করেই যেন চারদিকে ভেঁপু, ড্রাম আর নাচের দল তৈরি হয়ে গেল। যেন এত দিন ঠিক এই মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিল বিশ্বকাপ।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। তাদের নামের পাশে রয়েছে সর্বোচ্চ পাঁচটি বিশ্বকাপ শিরোপা, যা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের নেই। ব্রাজিলিয়ান সমর্থকেরা যেখানেই যান না কেন, এই গৌরবময় ইতিহাস বুক ফুলিয়ে সঙ্গে নিয়ে যান। এবারও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। ম্যাচ শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই চারপাশ সবুজ আর হলুদে ছেয়ে গিয়েছিল।
সমর্থকদের স্লোগান অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল এবং তা থামার কোনো লক্ষণ ছিল না। তারা স্লোগান দিচ্ছিলেন, “ক্রিস্টিয়ানো এসেছে পর্যটক হিসেবে, মেসিকে নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই, কারণ আমাদের নেইমার আছে।” এই ম্যাচে নেইমার আসলে চোটের কারণে দলে ছিলেন না। কিন্তু তাও সমর্থকেরা বুক চিতিয়ে আনন্দের সাথে তার নাম ধরে চিৎকার করছিলেন।
ম্যাচ শুরুর আগে যখন এই সুপারস্টার নিজে অত্যন্ত শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে মাঠে প্রবেশ করলেন এবং স্টেডিয়ামের বিশাল স্ক্রিনে তার ছবি ভেসে উঠল, তখন দর্শকদের চিৎকার যেন কান ফাটানো গর্জনে রূপ নিল। বিরাশি হাজারেরও বেশি দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মেটলাইফ স্টেডিয়ামটি তখন আক্ষরিক অর্থেই কাঁপছিল।
মাঠে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছিল এক সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী মরক্কো। কাতারে ২০২২ বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস তৈরি করেছিল তারা। সেই একই শৃঙ্খলা এবং দলীয় সংহতি নিয়ে এই ম্যাচেও খেলতে নামে মরক্কো। তারা এখানে শুধু সংখ্যা বাড়াতে আসেনি, শুরু থেকেই তা ছিল স্পষ্ট।
ম্যাচের প্রথমার্ধের শুরুতেই এক গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ার পর ভিনিসিয়াস জুনিয়র এক চোখধাঁধানো একক প্রচেষ্টায় সেলেসাওদের সমতায় ফেরান। তিনি বাম প্রান্ত থেকে বল পেয়ে প্রতিপক্ষের এক ডিফেন্ডারকে যেন মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রেখে কাটিয়ে ভেতরে ঢোকেন। এরপর চমৎকার শটে বল দূরের কোণ দিয়ে জালে জড়িয়ে দেন। এটি ছিল খাঁটি ব্রাজিলিয়ান ঘরানার গোল।
তবে পুরো দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স ছিল বেশ মেলানো-মেশানো। ফুল-ব্যাকদের বেশ নড়বড়ে দেখিয়েছে। তারা বারবার নিজেদের জায়গা ছেড়ে ভুল পজিশনে চলে যাচ্ছিলেন। যেকোনো সেরা ব্রাজিল দলের আসল শক্তি হয় তাদের মিডফিল্ড। কিন্তু এই ম্যাচে মিডফিল্ডে দূরদর্শিতা এবং সৃজনশীলতার অভাব ছিল স্পষ্ট। আর দলের একমাত্র স্ট্রাইকার হয়তো আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার সময়ই তার গোল করার জুতো জোড়া কোথাও ভুল করে ফেলে এসেছিলেন। তার সহজ সুযোগ নষ্ট করার দৃশ্যগুলো ছিল মাঝেমধ্যে বেশ কষ্টদায়ক।
১৯৯৪ এবং ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলের তারকা এবং এই টুর্নামেন্টের দূত রোনালদো নাজারিও গ্যালারিতে বসে খেলা দেখছিলেন। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছিল তিনি মনে মনে কোনো জটিল হিসাব মেলাচ্ছেন।
শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্রতে শেষ হয়।
এই ফলাফলের কারণে ব্রাজিলের কিংবদন্তি কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে প্রথম ম্যাচের পরেই বেশ বড় একটি কাজের তালিকা নিয়ে বসতে হচ্ছে। তিনি পাঁচটি ইউরোপীয় শিরোপাসহ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল ম্যানেজার। আগামী ম্যাচের আগে ফুল-ব্যাক পজিশনে কৌশলী পরিবর্তন, মিডফিল্ডের সৃজনশীল সমাধান এবং ভিনিসিয়ুস ও রাফিনহাদের তৈরি করা সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারে এমন একজন স্ট্রাইকার খুঁজে বের করার মতো অনেক কিছু নিয়ে তাকে এখন চিন্তা করতে হবে।
কিন্তু মেটলাইফ স্টেডিয়ামের বাইরে এসে যখন কেউ সেই হলুদ-সবুজের সমুদ্রে পা দিচ্ছিলেন, তখন এই সব হিসাব-নিকাশ যেন মুহূর্তেই অর্থহীন হয়ে যাচ্ছিল। ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের কাছে এই ম্যাচের ফলাফল কেবলই একটি সাধারণ বিষয় মাত্র। এটি আসলে কোচ, পণ্ডিত এবং কৌশলবিদদের আলোচনার বিষয়।
শনিবার সমর্থকদের কাছে আসল বড় বিষয় ছিল এই, তাদের কাঙ্ক্ষিত উৎসবের আগমন ঘটেছে। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে জোরালো এবং সবচেয়ে আনন্দময় সংক্রামক উৎসবটি অবশেষে শুরু হয়ে গেছে। চারদিকে পতাকা উড়ছিল, অপরিচিত মানুষেরা একে অপরের সাথে নাচছিলেন এবং ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার অনেক পরও ড্রামের আওয়াজ থামেনি। ব্রাজিল হয়তো ম্যাচটি জিততে পারেনি, কিন্তু তারা মানুষের মন জয় করে নিয়েছে।
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। তাই টুর্নামেন্টের এই শুরুতেই তাদের হিসাবের বাইরে ফেলে দেওয়া অন্য দলগুলোর জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। গ্যালারিতে থাকা রোনালদো অন্য যেকোনো মানুষের চেয়ে ভালো জানেন, এই দলটির আসল সময়ে নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দেওয়ার এক দারুণ অভ্যাস রয়েছে।
সেলেসাওরা এসে গেছে এবং সেই সাথে অফিশিয়ালি শুরু হয়ে গেছে বিশ্বকাপের আসল মহোৎসব।


