ব্যাংকিং অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের একের পর এক অভিযোগ, দুর্নীতি দমন কমিশনের চার্জশিট, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে ওঠা আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং হাইকোর্টের সরাসরি হস্তক্ষেপ–এত কিছুর পরও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান এখনো বহাল আছেন দায়িত্বে। এই বাস্তবতা শুধু ব্যাংকের একজন বিতর্কিত প্রধানের গল্প নয়। এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরবতা, অসংগতি ও ব্যর্থতার একটি স্পষ্ট দলিল, যা দেশের ব্যাংকিং সুশাসনকে গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) মো. হাবিবুর রহমানকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে একটি চিঠি পাঠায়। এতে বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালিত পরিদর্শনে তার বিরুদ্ধে যমুনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকে দায়িত্বপালনকালে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতিতে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অভিযোগগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংকে থাকাকালে করা অনিয়ম। ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভিত্তিক বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নিরীক্ষা কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণ বিতরণে সংঘটিত অনিয়মে হাবিবুর রহমানের সংশ্লেষ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৩০টি প্রতিষ্ঠানে মোট ২ হাজার ৬৪১ কোটি টাকার ঋণ ক্ষতিজনক হিসেবে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ এস আলম-সংশ্লিষ্ট অস্তিত্ববিহীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইউনিয়ন ব্যাংকের বিনিয়োগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে হাবিবুর রহমান ঋণমঞ্জুরিপত্রের শর্ত ভেঙে এবং নিবন্ধিত বন্ধক ছাড়াই ঋণ অনুমোদনের সুপারিশ করেন। একাধিক ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ভূমি পরিদর্শন প্রতিবেদন, নিবন্ধিত বন্ধকি দলিল, রেজিস্টার্ড পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও প্রয়োজনীয় খতিয়ান ছাড়াই ঋণ অনুমোদনের নজির পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এসব কার্যক্রম সিআরএম গাইডলাইন্স ২০১৬-এর ধারার সরাসরি লঙ্ঘন। এই ধারায় ব্যাংকগুলোকে স্বাধীন ও সতর্ক ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যথাযথ মূল্যায়ন, যাচাইকৃত পর্যাপ্ত নথিপত্র এবং আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য জামানত ছাড়া কোনো ঋণ সুবিধা অনুমোদন বা সুপারিশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এই অনিয়মের বিষয়টি কেবল পরিদর্শন প্রতিবেদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ১৪০তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঋণ অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে মো. হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দাখিল করা হয়। ইউনিয়ন ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবী মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ২০২৫ সালের ৩ জুন ও ১৫ অক্টোবর দুই দফায় অভিযোগগুলো জমা দেন।
এর আগে যমুনা ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে বিসমিল্লাহ গ্রুপের কম্পোজিট টাওয়েল লিমিটেডকে অনিয়মের মাধ্যমে এফডিবিপি সুবিধা বা শিপমেন্ট পরবর্তী ঋণ সুবিধা অনুমোদনের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। শাস্তি হিসেবে তার এক বছরের ইনক্রিমেন্ট কাটা হয় এবং এক বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিত থাকে।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আরও গুরুতর। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ঋণ অনিয়মে সম্পৃক্ত থাকায় দুদক তাকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়। দুদকের মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে এবং তিনি জামিনে আছেন।
এতসব অভিযোগ, পরিদর্শন প্রতিবেদন ও চলমান আইনি প্রক্রিয়ার পরও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এমডি পদে তাকে বহাল রাখায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক সংস্থার অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও হাবিবুরের বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং বোর্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর পরও বাংলাদেশ ব্যাংক ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিল।
২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পর্ষদ সভায় উপস্থিত ১১ পরিচালকের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে মো. হাবিবুর রহমানকে ৯০ দিনের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ছয় পরিচালকের স্বাক্ষরিত কার্যবিবরণী বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয় এবং পরিচালকরা বিআরপিডিতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি অবহিত করেন। এমনকি তারা বিষয়টি সরাসরি গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকেও অবহিত করেন।
কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই, ৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে, বিআরপিডি থেকে পাঠানো এক চিঠিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই হাবিবুর রহমানের তিন বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষের পথে থাকায় পুনর্নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি আদালতে গড়ালে ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগ স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পর্ষদকে নির্দেশ দেন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পুনর্নিয়োগ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে। বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী স্টান্ডার্ড ব্যাংকের পর্ষদকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করে জানতে চান, আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়া এই প্রস্তাব কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না।
আদালতের এই হস্তক্ষেপ ব্যাংকের পর্ষদে চলমান বিভক্তির চিত্রও সামনে এনেছে। এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ, অন্য পক্ষের নেতৃত্বে তার ছেলে ও ভাইস চেয়ারম্যান একে এম আব্দুল আলীম। আলীমের নেতৃত্বাধীন গ্রুপের অভিযোগ, ৭ জানুয়ারির বোর্ড সভা শেষে তারা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ত্যাগ করার পর চেয়ারম্যানপন্থী একটি অংশ পুনরায় পর্ষদ কক্ষে প্রবেশ করে হাবিবুর রহমানের নবায়ন সংক্রান্ত প্রস্তাব কার্যবিবরণীতে যুক্ত করে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায়।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, পর্ষদে ঐকমত্য বা সুপার মেজরিটি ছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুর রহমানের পুনর্নিয়োগ গ্রহণযোগ্য হবে না। এর একদিন পরেই গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সাংবাদিকদের বলেন, ১০ জন পরিচালকের মধ্যে অন্তত ৯ জন একমত না হলে স্টান্ডার্ড ব্যাংকের এমডির পুনর্নিয়োগ বিবেচনায় নেওয়া হবে না।
তবে এসব বক্তব্য ও চিঠির পরও হাবিবুর রহমানের বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ফলে চার্জশিটভুক্ত ও অভিযুক্ত একজন ব্যাংকারের পুনর্নিয়োগের চেষ্টা এবং সেই প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে ব্যাংকিং খাতে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
মন্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও মো. হাবিবুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তদন্তে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, বহু অভিযোগের পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সমর্থনের কারণে এখন পর্যন্ত হাবিবুর রহমান দায়িত্বে থাকতে পেরেছেন।
এমডিকে নিয়ে চলমান বিতর্ক প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান টাইমসকে বলেন, মো. হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো তদন্তাধীন রয়েছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানে যেসব বিষয় উঠে এসেছে সেগুলো নিয়ে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এমডির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে এবং তিনি তার ব্যাখ্যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিয়েছেন। এই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন এবং তার সুনাম ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যেই এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে।


