কুড়িল ফ্লাইওভারের ঠিক পাশ ঘেঁষেই, ব্যস্তময় এক্সপ্রেসওয়ে থেকে মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে ওঁত পেতে আছে ঢাকা শহরের আতঙ্কময় এক রেলক্রসিং। যেখানে নেই নিরাপত্তার কোনো ছিটেফোঁটা।
নামে রেলক্রসিং হলেও, এখানে নেই কোনো গেট, কোনো সিগন্যাল বা নিদেনপক্ষে কোনো তদারকি। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই রেলপথ পাড়ি দেন অনেকটা বাধ্য হয়ে। মনের মধ্যে চাপা ভয় নিয়ে পার হন রেলক্রসিং, প্রার্থনা করতে থাকেন যেন যমদূতের মতো হুট করে এসে না পড়ে ছুটে চলা ট্রেন।
নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এক পথচারী বলেন, ‘কুড়িল রেলক্রসিং সামনে থেকে দেখলে মনে হবে একটা হরর মুভির বাস্তব প্লট। একদিন রেলক্রসিং পার হচ্ছিলাম। দুদিক দেখেই পার হচ্ছিলাম। ঠিক দুটো লাইন পার হতে না হতেই একটা ট্রেনকে দেখলাম ঝড়ের বেড়ে এগিয়ে আসতে। সেটিকে একবারও হর্ন দিতে শুনিনি। হুট করে ট্রেন দেখে আমি আতঙ্কে জমে গিয়েছিলাম। পা নাড়াতে পারছিলাম না। কেউ পেছন থেকে টেনে না ধরলে আজ হয়তো পুলিশের খাতায় আমারও নামও থাকত।’
কুড়িলের রেলক্রসিংকে অস্বাভাবিক বললেও কম বলা হবে। দুটি লেনের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে, অন্য দুটি এখনো নির্মাণাধীন। ধারালো পাথর আর নড়বড়ে ইটের ওপর ভর দিয়ে পথচারীদের লাফিয়ে লাফিয়ে এগোতে হয়।
পথচারী বা রাস্তা পারাপারের মাঝ দিয়ে রেল লাইন গেলে সেটি সাধারণত সমান করে দেওয়া হয়। কিন্তু এখানে চিত্র পুরোপুরি উল্টো। রাস্তা থেকে আরও উঁচুতে উঠে গেছে লাইনগুলো। রাস্তা পারাপার সহজ করার বদলে তা আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
খেয়াল করলে দেখা যাবে রেলক্রসিংয়ের দুপাশেই বাঁক রয়েছে। বাঁক না পেরোনো পর্যন্ত ট্রেন আসছে কিনা তা বোঝার উপায় নেই। আর যতক্ষণে ট্রেন বাঁক পেরোয়, ততক্ষণে চার লাইনের রাস্তা পেরোনোর সময় থাকে না হাতে। কখনো কখনো একটি ট্রেন যেতে না যেতেই অন্য লাইনে আরেকটি হাজির হয়।
যদি হর্ন না দেয়, সিগন্যালও না দেখা যায়, গেটও না বন্ধ হয় তাহলে পরিস্থিতি কী হতে পারে তা আন্দাজ করাই যায়।
কুড়িল রেলক্রসিং পাঁচটি ব্যস্ত সড়কের সংযোগস্থল। একদিকে পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ের আসা-যাওয়ার দুটো রাস্তা, অন্যদিকে কুড়িল ফ্লাইওভার, বাকি পথ দিয়ে বাড্ডা-রামপুরার যাত্রা।
ফার্মগেট বা গুলিস্তানের পথগামী যাত্রীরা বাধ্য হয় এই রেলক্রসিং পেরোতে।

যেখানে নির্মাণাধীন রেললাইনের ফাঁকে ফাঁকে আছে চায়ের টং, জামাকাপড় ও খাবারের ভাসমান দোকান। কিন্তু নেই কোনো ফুটওভার, কোনো ব্যারিকেড। কোনো গেটকিপার। কোনো সিগন্যাল। মাঝে মাঝে শুধু ভিআইপি আসার খবর পেলে দেখা যায় পুলিশের উপস্থিতি। বাকি সময়টুকুতে কপালের ওপর ভরসা করেই চলে সবাই।
মাঝেমধ্যে কপাল সায় দেয় না। যেমনটা ঘটেছে গত ৭ অক্টোবর। এই ক্রসিং পেরোতে গিয়ে তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান এ এম বিপুল। তার পাঁচ মাস আগে সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেসের ধাক্কায় প্রাণ হারান অনার্স শিক্ষার্থী ইসতিয়াক আহমেদ সাফিদ। জানুয়ারিতে একইভাবে মারা যান গাড়ির হেলপার তবী কর্মকার।
জানুয়ারি থেকে অক্টোবর ২০২৫-এই সময়ে ঢাকায় রেলপথে প্রাণহানি হয় ৫৭ জনের। তেজগাঁও এলাকায় ২৯ জন, ক্যান্টনমেন্টে ২১ জন। পুলিশের মতে, কুড়িল রেলক্রসিংয়ের নাম আলাদা করে উল্লেখ না থাকলেও, এই সংখ্যায় তার সমীকরণ স্বীকার করতেই হয়।
রেলক্রসিংয়ের পাশেই আছে ওসমান গণির চায়ের দোকান। তার কণ্ঠেও একই আকুতি।
তিনি বলেন, ‘আমি এ পর্যন্ত অন্তত ২০ জনকে মরতে শুনছি। এইখানে রেলের লোক আসছিল। কইছে দুই মাসের মধ্যে ফুটওভার হবে। ছয় মাস হইয়া গেল। কিছুই হয় নাই।’
বিআরটিসির টিকিট বিক্রেতা রাসেল আহমেদও জানান, প্রতি মাসে চার-পাঁচজন মারা যায়। কখনো মনে হয়, জায়গাটা অভিশপ্ত।
কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি ফেরদৌস আহমেদ বিশ্বাসের মতে কুড়িল হলো, ‘ক্রিটিক্যাল ডেঞ্জার জোন’। তার কার্যালয় বহুবার অভিযোগ পাঠিয়েছে, ছবি পাঠিয়েছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা চেয়েছে—কিন্তু কোনো পরিবর্তন আসেনি।
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি মৃত্যু প্রতিরোধ করা যেত। কিন্তু কিছুই বদলায় না। একটা জীবন যায়, একটা ফাইল বন্ধ হয়।’
কুড়িল রেলক্রসিং দিয়ে দুই দিক থেকে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলে। এতে পথচারীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং সাবধানে পার হওয়ার মতো সময়ও হাতে থাকে না।
এই পথের ডিজাইনটাই বিপজ্জনক বলে মনে করেন গার্মেন্টস কর্মী আল আমিন বেপারী। তিনি বলেন, ‘দুই পাশে বাঁক থাকায় বোঝা যায় না ট্রেন আসছে। লাইনগুলো লাফাতে লাফাতে পার হতে হয়। এটা একটা ট্র্যাজেডির জায়গা।’
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ মো. সিরাজ জিন্নাত স্বীকার করেন, কুড়িলে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই।
তিনি বলেন, ‘রাস্তা পারাপার ঠেকাতে একটি দেয়াল তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বিকল্প পথ না থাকায় স্থানীয়রা তা ভেঙে ফেলেছে। মানুষ নিজের ঝুঁকিতে পার হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সতর্ক করেছি, কিন্তু বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ঢাকা–টঙ্গী থার্ড লাইন–ফোর্থ লাইন প্রকল্পের অধীনে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে দেয়াল পুনর্নির্মাণ করা হবে। তবে কবে শেষ হবে, বলতে পারছি না।’
রেলওয়ে পুলিশ সুপার সাইফুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘দেয়াল আর ফুটওভার ব্রিজের জন্য আমরা বছরের পর বছর ধরে অনুরোধ করছি। কিন্তু কিছুই হয় না।’
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, কুড়িলের এই মৃত্যু-দৃশ্য সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল ওয়াকিল বলেন, ‘এখানে বারবার মৃত্যু হচ্ছে, এটা কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রতিফলন। ভাঙা দেয়াল মানুষের হতাশার গল্প বলে। নিরাপত্তা না থাকলে মানুষ শর্টকাট নেবে। দ্রুত ব্যবস্থা নিলে মানুষ আবার দেয়াল ভাঙত না। অবহেলাই বিপদকে বড় করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়, এটি কর্তব্য। একই জায়গায় বারবার মৃত্যু ঘটলে তা মানুষের অবহেলা নয়, দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলা।’
কুড়িলের প্রাণঘাতী ক্রসিং আজও একই রূপে আছে। যে রেললাইনের পাশে চায়ের কাপে চুমুক দেয় অন্যরা, সেই রেললাইনই কেড়ে নেয় জীবন।
একেকটা হর্ন যখন বাতাসে মিলিয়ে যায়, বিপদের হাতছানি ততটা কাছে মনে হয়। পথচারীরা জীবন বাজি রেখে রাস্তা পার হয়। সূরা পড়তে থাকে একের পর এক, প্রার্থনা করে আজকের দিনটা অন্তত নিরাপদ হোক।


