সেই আলকাছ মল্লিককে বনদস্যু বললেন জিয়াউলের বোন!

সেই আলকাছ মল্লিককে বনদস্যু বললেন জিয়াউলের বোন!
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

আলকাছ মল্লিককে বনদস্যু বলে দাবি করেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বোন ও তার আইনজীবী নাজনীন নাহার। তার বক্তব্য, আলকাছকে জিয়াউল চিনতেন না। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে অন্তত দুজন সাক্ষী আলকাছকে র‍্যাবের সঙ্গে নৌযান চালানোর কাজে যুক্ত একজন মাঝি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তাদের অভিযোগ, র‍্যাবের অভিযানে ব্যবহৃত নৌকার মাঝি হিসেবে কাজ করা আলকাছ নদীতে নিয়ে হত্যা বা গলফ অপারেশন সম্পর্কে তথ্য জানতেন এবং এ কারণে তাকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন জিয়াউল আহসান। পরে র‍্যাবের পরিচয়ে ফোন করে ডেকে নেওয়ার পর আলকাছ নিখোঁজ হন বলে সাক্ষীরা জানিয়েছেন।

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক গুম ও হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের মামলার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাজনীন নাহার।

তিনি বলেন, আলকাছ মাঝি ছিলেন একজন বনদস্যু। তার ভাই আব্বাস মল্লিকও বনদস্যু ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। নাজনীনের ভাষ্য, ২০১৮ সালে সরকার বনদস্যুদের পুনর্বাসনের সময় আলকাছকে বরিশালের র‍্যাব-৮-এ মালির চাকরি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেই চাকরি ছেড়ে এলাকায় ফিরে দিনমজুরের কাজ শুরু করেন।

নাজনীন বলেন, র‍্যাব-৮-এ চাকরির সময় আলকাছ মাসে অন্তত ১৫ হাজার টাকা বেতন ও খাবার পেতেন। তার প্রশ্ন, সেই চাকরি ছেড়ে তিনি দিনমজুরের কাজ করতে গেলেন কেন? নাজনীনের দাবি, এর কারণ আলকাছ তখনো বনদস্যুতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি আরও বলেন, জিয়াউল আহসান সেই আলকাছকে চিনতেন না।

তবে ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষীদের বক্তব্যে আলকাছের নিখোঁজ হওয়ার সময় ও পরিস্থিতি সম্পর্কে ভিন্ন বিবরণ উঠে এসেছে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. সাব্বির রহমান ওসমানী ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেন।

তিনি দাবি করেন, ২০১১ সালের জুনে জিয়াউল আহসান তাকে ফোন করে আলকাছ মাঝির বিষয়ে জানতে চান। সাব্বির জানান, আলকাছ সম্পর্কে তার তেমন কিছু জানা নেই। তবে তিনি জিয়াউলকে বলেন, আলকাছ তার ‘গলফ’ অভিযানে নৌকা চালানো মাঝিদের একজন ছিলেন।

সাব্বিরের জবানবন্দি অনুযায়ী, আলকাছকে নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা এবং তার বেতন-ভাতার বিষয়গুলো র‍্যাব-৮-এ সংযুক্ত ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সদস্যরা দেখভাল করতেন। এ কথা শুনে জিয়াউল কিছুটা বিরক্ত হন বলে দাবি করেন সাব্বির।

সাব্বির বলেন, জিয়াউল তাকে জানান, আলকাছ চরদুয়ানী বাজারে ‘গলফ অপারেশন’ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য বলে বেড়াচ্ছেন, যা র‍্যাবের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এরপর জিয়াউল সেই আলকাছকে ‘এলিমিনেট’ করতে তাকে নির্দেশ দেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সাব্বির।

আরও পড়ুন

সাব্বিরের ভাষ্য, নির্দেশটি শোনার পর তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে দায়িত্বটি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। একপর্যায়ে জিয়াউল বলেন, ‘থাক, লাগবে না।’

র‍্যাবের পরিচয়ে ডেকে নেওয়ার পর নিখোঁজ

সাব্বিরের জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই ঘটনার আনুমানিক এক সপ্তাহ পর র‍্যাব-৮-এ তার অধিনায়ক তাকে দ্রুত অফিসে যেতে বলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর অধিনায়ক কয়েকজনকে আলকাছের পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।

আলকাছের স্ত্রী অধিনায়ককে জানান, চার-পাঁচ দিন আগে জিয়াউল আহসানের কথা বলে আলকাছকে মোবাইল ফোনে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে আলকাছ স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন, জিয়াউল তাকে ডেকেছেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না এবং তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।

সাব্বির বলেন, পরিবারের কথা শুনে তার ও অধিনায়কের আলকাছের পরিণতি সম্পর্কে বুঝতে অসুবিধা হয়নি। অধিনায়ক নিখোঁজ আলকাছকে খুঁজে বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানোর আশ্বাস দেন।

একই সঙ্গে আলকাছ ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সঙ্গে কাজ করতেন বলে তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি র‍্যাব সদর দপ্তরকে জানানোর পরামর্শ দেন। পরে পরিবারটিকে কিছু আর্থিক সহায়তা দিয়ে বিদায় করা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন সাব্বির।

আলকাছের ভাই আব্বাস মল্লিকও ২ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে একই ধরনের অভিযোগ করেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আমার ছোট ভাই আলকাছ র‍্যাবের সঙ্গে নৌযান চালানোর কাজে যুক্ত ছিল। ২০১১ সালের মাঝামাঝি র‍্যাবের পরিচয়ে ফোন করে তাকে জিয়াউল আহসানের সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়। এরপর তিনি নিখোঁজ হন।

আব্বাসের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনে বলা হয়েছিল, ‘জিয়া স্যার তোমাকে বটতলা মানিকখালী আসতে বলেছে।’ সেদিন দুপুরে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সন্ধ্যা ৭টা বা ৮টার দিকে আলকাছের স্ত্রী তাকে ফোন করে জানান, আলকাছের ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

আব্বাস বলেন, পরিবারের সদস্যরা পরে বিভিন্ন জায়গায় আলকাছকে খুঁজেছেন। তারা খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকার র‍্যাব কার্যালয়ে গিয়েও তার সন্ধান পাননি। পরে পাথরঘাটা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। তার অভিযোগ, জিডিতে জিয়াউল আহসান ও র‍্যাবের নাম অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ জানানো হলেও পুলিশ তা করেনি।

অভিযানে বন্দীদের হত্যার বর্ণনা

আব্বাস মল্লিক তার জবানবন্দিতে ২০১০ সালে র‍্যাবের অভিযানে বন্দীদের হত্যারও বর্ণনা দেন। তার দাবি, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ধরে আনা ব্যক্তিদের হাত ও চোখ বেঁধে নৌকায় তোলা হতো। পরে গভীর নদীতে নিয়ে তাদের গুলি করে হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। এসব হত্যাকাণ্ডে জিয়াউল আহসান সরাসরি অংশ নিতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

আব্বাসের বর্ণনা অনুযায়ী, র‍্যাব সদস্যরা চরদুয়ানী ও কাঠালতলী এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন এবং অভিযানের জন্য স্থানীয় বোটমালিকদের নৌকা দিতে বলতেন। রাতের দিকে মাইক্রোবাসে করে হাত ও চোখ বাঁধা বন্দীদের আনা হতো। তাদের সঙ্গে সিমেন্টের বস্তা, রশি ও হোগলা নেওয়া হতো। এরপর মাঝিদের নৌকা চালিয়ে বলেশ্বর নদীর গভীর পানিতে যেতে বলা হতো।

সাক্ষীর দাবি, গভীর পানিতে বন্দীদের নৌকার নির্দিষ্ট অংশে নিয়ে গুলি করা হতো। পরে তাদের গলায় বা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হতো।

আলকাছের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে আব্বাস বলেন, আমার ভাই র‍্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে বাজারে আলোচনা করত। এ কারণে অন্য বোটমালিকেরা তাকে সতর্ক করে বলতেন, র‍্যাব তার ওপর ক্ষুব্ধ। আব্বাসের দাবি, র‍্যাবের পরিচয়ে ফোন পাওয়ার পর আলকাছ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান, কিন্তু আর ফিরে আসেননি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad