আগা খান পুরস্কার পাওয়া বাংলাদেশি স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী তার নতুন ‘মনোগ্রাফ গ্রন্থ মেডিটেশনস ইন এনট্রপি: দ্য ওয়ার্ক অব কাশেফ চৌধুরি’র উন্মোচন অনুষ্ঠানে স্থাপত্যকে জলবায়ু, ভূ-প্রকৃতি এবং সমষ্টিগত স্মৃতির প্রতি এক গভীর ও সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরেছেন।
শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকার গুলশানে ক্রাউন প্লাজা বলরুমে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে আর্কিকানেক্ট।
অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্যে পরিবেশগত ঝুঁকি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা প্রায় তিন দশকের স্থাপত্যচর্চার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন কাশেফ চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো অঞ্চলে স্থাপত্যকে কেবল রূপ বা নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না, বরং জলবায়ু চাপ, মানুষের সহনশীলতা এবং স্থানিক বাস্তবতার প্রতি অর্থবহ সাড়া দেওয়াই এর মূল দায়িত্ব।’
তিনি বলেন, ‘গত প্রায় ২০ বছর ধরে জলবায়ু সংবেদনশীল সামাজিক প্রকল্পের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে এই বইটি লেখা হয়েছে। যেখানে বর্তমান সংকট ও বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে।’
‘কম বাজেটে কীভাবে আলো-ছায়াকে নকশার প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, গ্রামমুখী চিন্তা ও শহরমুখী অভিবাসনের বিপরীতে গ্রামে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ এবং সেখানকার ছোট ছোট সামাজিক প্রকল্পগুলো তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে।’
স্থপতি কাশেফ চৌধুরী বলেন, ‘এই বইটি কোনো স্থাপত্য-অবয়বের উদযাপন নয়, বরং এটি একটি প্রক্রিয়ার প্রতিফলন; যেখানে সংযম, প্রেক্ষাপট এবং সহমর্মিতা থেকে স্থাপত্যের জন্ম হয়।’
বইটি লেখার পেছনের ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি সংক্ষেপে তুলে ধরেন প্রতীথযশা এই স্থপতি।
সুইজারল্যান্ডের জুরিখভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা পার্ক বুকস থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থ কাশেফ চৌধুরীর কাজের ওপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ মনোগ্রাফ। পাঁচশ’র বেশি পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে স্কেচ, নকশা, আলোকচিত্র ও বিশ্লেষণধর্মী লেখার মাধ্যমে গত ৩০ বছরের স্থাপত্যচর্চা নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন ধরন ও পরিসরের ১৮টি বাস্তবায়িত প্রকল্পের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বইটিতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থাপত্য আলোকচিত্রী হেলেন বিনের আলোকচিত্র এবং কেনেথ ফ্র্যাম্পটন, উইলিয়াম জে. আর. কার্টিস, রবার্ট ম্যাককার্টার, আইনুন নিশাত ও ফিলিপ উরস্প্রুং-এর সমালোচনামূলক প্রবন্ধ সংযোজিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সি. আর. আবরার। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত মি. রেতো রেংগ্লি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আবরার সমাজ ও পরিবেশগত বাস্তবতার গভীরে প্রোথিত স্থাপত্যচিন্তার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘কাশেফ চৌধুরীর কাজ প্রমাণ করে, নকশা কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়নের চ্যালেঞ্জের প্রতি বুদ্ধিদীপ্ত ও সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।’
অনুষ্ঠানে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, ‘পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের আরও কঠিন বাস্তবতা আগামী ৫০ বছর পর মানুষকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। এর ফলে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে চাষাবাদের প্রচলিত পদ্ধতিতেও পরিবর্তনে বাধ্য হবে মানুষ।’
পরিবর্তনের এই ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন আইনুন নিশাত। অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও আগামীর চ্যালেঞ্জ মাথায় রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে অতিথি বক্তা ছিলেন প্রখ্যাত স্থপতি ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শামসুল ওয়ারেস এবং ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশের সভাপতি আবু সাঈদ এম আহমেদ। তারা প্রকাশনাটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য-নথি হিসেবে উল্লেখ করেন, যা স্থানীয় বাস্তবতার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে বাংলাদেশের স্থাপত্যচর্চাকে বৈশ্বিক আলোচনার পরিসরে তুলে ধরেছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির আর্কিটেকচার বিভাগের অধ্যাপক শামসুল ওয়ারেশ বলেন, ‘আর্কিটেকচার শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি বড় দায়িত্ব।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আবু সাঈদ মো. আহমেদ বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি স্থপতিদের যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে এই বইটি উদাহরণ হতে পারে।’
সুইজারলান্ডের রাষ্ট্রদূত মি. রেটো রেঙ্লি বলেন, ‘কাশেফ চৌধুরীর এই বইটি আগামী দিনের স্থাপত্যশিল্পের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।’
শিক্ষা উপদেষ্টা আবরার বলেন, ‘খুব সাবলীল একটি বই লিখেছেন, যেটি খুব তথ্যবহুল। সীমিত সম্পদ ও ভূ-প্রকৃতির কাঠামো বিশ্লেষণ করে অবকাঠামো তৈরি করার বিষয় তুলে ধরেছেন।’ নির্মাণ কাজের খরচ কমানোর সহজ পদ্ধতি তুলে ধরার পাশাপাশি আলো ও বাতাসের অপূর্ব সমন্বয় করেছেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন দেশের বিশিষ্ট স্থপতি, শিক্ষাবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ, শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।


