সিলেটের ঝা-চকচকে সুন্দর এক নতুন ২৫০ শয্যার হাসপাতাল। পুরোপুরি নির্মাণ শেষে সেবার জন্য প্রস্তুত। তবুও ভবনটি এখন এক ভুতুড়ে নিস্তব্ধতায় ঘেরা। সেখানে নেই চিকিৎসকদের ব্যস্ততা, নেই নার্সদের আনাগোনা, আর নেই রোগমুক্তি প্রত্যাশী রোগীদের ভিড়। সেখানে আছে শুধু এক বিশাল ভবনের হাহাকার—যেখানে সব আছে, নেই শুধু প্রাণস্পন্দন।
এটি কোনো কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়; এটি সিলেট শহরের নতুন জেলা হাসপাতাল, যা ২০২৩ সালে নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু এখনো মানুষের সেবার জন্য চালু করা সম্ভব হয়নি।
এই হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়েছে জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে, সিলেটের ১৫০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ‘আসাম প্যাটার্ন’ স্থাপত্যের আবু সিনা হোস্টেল ভেঙে। অথচ এর ঠিক কাছেই মদিনা মার্কেট এলাকার একটি মাতৃসেবা কেন্দ্র শহর থেকে সরিয়ে শহরতলীতে নিয়ে যাওয়ায় প্রসূতি মায়েদের এখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। অভিযোগ আছে, এই স্থানান্তর রোগীদের সুবিধার জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক স্বার্থে করা হয়েছে।
সিলেটের স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত চিত্র এখন এমনই: সরকারি মানচিত্রে অসংখ্য চিকিৎসাকেন্দ্রের চিহ্ন থাকলেও সেখানে নেই প্রয়োজনীয় কর্মী, ওষুধ কিংবা জীবন বাঁচানোর সঠিক পরিকল্পনা। পরিসংখ্যানে এই অঞ্চল বেশ সমৃদ্ধ; এখানে আছে ৩৭০টি কমিউনিটি পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ৯০০ শয্যার একটি বিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও প্রতিনিয়ত নতুন ভবন উঠছে। কিন্তু বাইরের এই চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য এক গল্প—ডাক্তারহীন ক্লিনিক, ওষুধহীন ফার্মেসি আর উপায়হীন রোগী। এ যেন কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নেই। এটিই সিলেটের উন্নয়নের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য—অবকাঠামো দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু সেবার মূল ভিত্তি মানুষই সেখানে ব্রাত্য।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ধরন
সিলেটের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর এই দুর্দশার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব। ২০০৫ সালে মদিনা মার্কেটের জনপ্রিয় ‘জেলা মাতৃ ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র’টি দক্ষিণ সুরমার তেতলিতে সরিয়ে নেওয়া হয়। তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যের উদ্যোগে এই স্থানান্তরকে ‘উন্নয়ন’ হিসেবে প্রচার করা হলেও দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের জন্য এটি চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে ২০১৯ সালে। ঐতিহ্যবাহী আবু সিনা হোস্টেল ভেঙে জেলা হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। নাগরিক সমাজ এবং তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের প্রাথমিক আপত্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয় নির্মাণ কাজ। ভবনটি এখন প্রস্তুত, কিন্তু কোনো স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষই এর দায়িত্ব নিতে রাজি হচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে কোনো পরামর্শ না করেই এই অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এটি বুঝে নিতে খুব একটা আগ্রহী নয়। আর গণপূর্ত বিভাগও কাউকে ছাড়া ভবনটি হস্তান্তর করতে পারছে না।
সেবার বিভ্রম
সরকারি নথিতে সিলেটে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে ৩৭০টি স্বাস্থ্য কেন্দ্র থাকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। চিকিৎসক ও ওষুধের সংকট এবং সঠিক সমন্বয়ের অভাবে অধিকাংশ কেন্দ্রই এখন অকার্যকর। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলায় অন্তত ১০টি নতুন স্বাস্থ্য কেন্দ্র খোলা হলেও সেগুলোর যাত্রা শুরু হয়েছে জনবল সংকট নিয়ে।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, বিসিএস ক্যাডার চিকিৎসকদের ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়োগ দেওয়া হলেও অনেকেই সেখানে নিয়মিত বসেন না। রোগীরা মূলত সেখানে বিনামূল্যে ওষুধ নিতে যান। যখন ওষুধ পাওয়া যায় না, তখন রোগী আসাও বন্ধ হয়ে যায়।
সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা ও জৈন্তাপুরের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা গেছে, কিছু মানুষের একক প্রচেষ্টায় সেবা কার্যক্রম কোনোমতে টিকে আছে। খাদিমনগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পরিবার কল্যাণ সহকারী রঞ্জিতা রানী গত নয় মাস ধরে একা সবকিছু সামলাচ্ছেন। তিনি জানান, সেখানে কোনো উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নেই। তিনি একাই নিবন্ধন থেকে শুরু করে নার্সিং পর্যন্ত সব করছেন। গত নয় মাসে মাত্র একবার ওষুধ এসেছে, ফলে রোগী আসা অনেক কমে গেছে।
মোগলাবাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিত্রও একই; সেখানে ফার্মাসিস্ট আয়মান বিশ্বাসকেই প্রায় সব দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
পরিসংখ্যানে সংকট
জনবল সংকটের এই চিত্র পরিসংখ্যানে আরও স্পষ্ট। স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনে থাকা ২৫টি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মধ্যে ১১টিতেই চিকিৎসকের পদ খালি। এছাড়া ১৪টি উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার এবং ২৪টি ফার্মাসিস্টের পদও শূন্য। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ৬৯টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কোনো চিকিৎসকের পদই নেই। সেখানে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার এবং পরিবার কল্যাণ পরিদর্শকদের ওপর নির্ভর করতে হয়। অথচ ৬৪টি উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে মাত্র ১৯টি এবং ১১৩টি পরিবার কল্যাণ সহকারীর পদের মধ্যে মাত্র ৭৪টি পূরণ করা আছে।
সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মঞ্জয় দত্ত জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রোগীর প্রচণ্ড চাপ থাকায় সব উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে সার্বক্ষণিক ডাক্তার রাখা সম্ভব হয় না। ডাক্তাররা সপ্তাহে মাত্র এক বা দুদিন সেখানে যান, ফলে নিয়মিত তদারকি ব্যাহত হয়।
মূল সমস্যাটি অবকাঠামোর অভাব নয়, বরং সম্পদের সঠিক ব্যবহারের অভাব। সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্যমতে, এই অঞ্চলে মোট এক হাজার ৩১১টি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে আছে ৯০০ শয্যার হাসপাতাল একটি, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল তিনটি এবং উপজেলা পর্যায়ে ৩৫টি হাসপাতালসহ অসংখ্য কমিউনিটি ক্লিনিক ও ট্রমা সেন্টার। কিন্তু এই বিশাল নেটওয়ার্ক জনবল সংকটে মুখ থুবড়ে পড়ছে।
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর চাপ
তৃণমূলের কেন্দ্রগুলো যখন সেবা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সব রোগী গিয়ে ভিড় করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। প্রতিদিন সকালে ৩ থেকে ৪ হাজার বহিরাগত রোগী এখানে আসে। ৯০০ শয্যার এই হাসপাতালে ৩ হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকে। অথচ এই হাসপাতালের জনবল কাঠামো মাত্র ৫০০ রোগীর সেবার উপযোগী।
ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, এই সংকট শুধু এখানে নয়, পুরো সিলেট বিভাগের চারটি জেলা হাসপাতালেই জনবল খরা চলছে। যদি জেলা হাসপাতালগুলো ৫০০ শয্যায় উন্নীত করে পর্যাপ্ত জনবল দেওয়া যেত, তবেই কেবল ওসমানী হাসপাতালের ওপর থেকে এই অমানবিক চাপ কমানো সম্ভব হতো।
রাজনীতি নয়, পরিকল্পনা ও সমন্বয় চাই
স্থানীয় প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের মতে, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবেই আজ এই দশা। স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে সেবা দেওয়ার জায়গার চেয়ে রাজনৈতিক ‘শো-পিস’ বা ফিতা কাটার প্রকল্প হিসেবেই বেশি ব্যবহার করা হয়।
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. নিয়াজুর রহমান জানান, জমি দান করা হয় এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ভবন নির্মাণ করে। কিন্তু জনবল নিয়োগের কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা থাকে না। ফলে এই ভবনগুলো কেবল ফাঁকা খোলের মতো পড়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবন নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা এবং উদ্বোধনের আগেই জনবল নিশ্চিত করা জরুরি। যতক্ষণ পর্যন্ত বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় না বাড়বে এবং উপজেলা পর্যায়ের কমিটিকে জবাবদিহিতার আওতায় না আনা হবে, ততক্ষণ সিলেটের এই দৃষ্টিনন্দন ভবনগুলো কেবল উন্নয়নের এক করুণ বৈপরীত্য হয়েই দাঁড়িয়ে থাকবে।


