ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেট বিভাগে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মধ্যে মূল লড়াই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অধিকাংশ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও কোথাও কোথাও বিদ্রোহী ও জোটের শরিক প্রার্থীরা লড়াইকে আরও জমিয়ে তুলেছেন। ভোটারদের মতে, প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, ক্লিন ইমেজ ও সাংগঠনিক শক্তিই জয়-পরাজয়ের মূল নিয়ামক হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মাঠ পর্যায়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত আটটিতে বিএনপি এবং চারটিতে জামায়াত এগিয়ে রয়েছে। বাকি সাতটি আসনে চলছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস।
সিলেট জেলা
সিলেট জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে দুটিতে বিএনপি, দুটিতে জামায়াত ও দুটিতে সমানে সমান লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
সিলেট-১ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসনে আট প্রার্থী থাকলেও মূল লড়াই হবে বিএনপির খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও জামায়াতের হাবিবুর রহমানের মধ্যে। ক্লিন ইমেজের অধিকারী আব্দুল মুক্তাদির প্রচারণায় এগিয়ে থাকলেও ব্যবসায়ী ও বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে হাবিবুর রহমানও কড়া টক্কর দিচ্ছেন।
সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসনটি বিএনপির গুম হওয়া নেতা এম ইলিয়াস আলীর কারণে আবেগপ্রবণ একটি এলাকা। এখানে এগিয়ে আছেন ইলিয়াস আলীর স্ত্রী বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনা। তবে বিএনপির একটি অংশ তার পক্ষে এখনো মাঠে নামেনি। এতে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ মুনতাসির আলীর সঙ্গে তার লড়াই সমানে সমান হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে বিএনপির মোহাম্মদ আব্দুল মালিক ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দিন রাজুর অবস্থান সমানে সমান। আব্দুল মালিকের নিজস্ব বলয় থাকলেও মুসলেহ উদ্দিন রাজু তার বাবা প্রখ্যাত বুজুর্গ মাওলানা নুরুদ্দিন গহরপুরীর পরিচয়ে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন।
সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট) আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী এগিয়ে আছেন। তবে জামায়াতের জয়নাল আবেদীন ক্রমশই নিজের অবস্থান শক্তিশালী করছেন।
সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট) আসনে বিএনপি বা জামায়াত নিজেদের প্রার্থী দেয়নি। এখানে বিএনপি জোটের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের উবায়দুল্লাহ ফারুক (খেজুর গাছ)। অন্যদিকে জামায়াত জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আব্দুল হাসান (দেওয়াল ঘড়ি)। এ ছাড়াও শক্তিশালী প্রার্থী হিসাবে মাঠে আছেন বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ (ফুটবল)। তাদের মধ্যে এখানে ত্রিমুখী হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। অতীতে এই আসনে একাধিকবার জয়ী হয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী।
সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনে ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও জামায়াতের মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন তার বিশাল কর্মী-বাহিনী নিয়ে বিএনপির এমরান আহমদ চৌধুরীর চেয়ে বর্তমানে কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন।
সুনামগঞ্জ জেলা
হাওর এলাকা সুনামগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও বাকিগুলোতে পরিস্থিতি ভিন্ন।
সুনামগঞ্জ-১ (ধর্মপাশা, তাহিরপুর, মধ্যনগর ও জামালগঞ্জ) আসনে বিএনপির কামরুজ্জামান কামরুল জামায়াতের তোফায়েল আহমদের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই ও শাল্লা) আসনে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ বিএনপির নাছির উদ্দীন চৌধুরীর চেয়ে ভোটারদের তথ্যে এগিয়ে আছেন জামায়াত প্রার্থী শিশির মনির।
সুনামগঞ্জ-৩ (শান্তিগঞ্জ ও জগন্নাথপুর) আসনে জোটের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আনোয়ার হোসেন সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। তার সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন বিএনপির দলীয় প্রার্থী কয়ছর আহমেদ। এখানে জামায়াত জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের শাহীনূর পাশা।
সুনামগঞ্জ-৪ (সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী নুরুল ইসলাম নুরুল এগিয়ে থাকলেও বিদ্রোহী প্রার্থী চার বারের উপজেলা চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন এই ভোটে ভাগ বসাবেন। সেক্ষেত্রে লড়াই ত্রিমুখী করে তুলতে পারেন জামায়াতের শামস উদ্দীন।
সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক ও দোয়ারাবাজার) আসনে বিএনপির কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলনের বিপরীতে জামায়াতের প্রার্থী আবু তাহির মুহাম্মদ আব্দুস সালাম মাদানী। এই আসনে স্পষ্টতই এগিয়ে আছেন বিএনপির মিলন।
হবিগঞ্জ জেলা
হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ ও বাহুবল) আসনে বিএনপিতে যোগ দিয়েই দলের মনোনয়ন পেয়ে গেছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এস এম কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া। তবে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আছেন বিদ্রোহী প্রার্থী বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নেতা শেখ সুজাত মিয়া। তাদের মধ্যে এখানে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।
হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ) আসনে বিএনপির আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবন তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বেশ এগিয়ে আছেন। এখানে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আবদুল বাছিদ আজাদ।
হবিগঞ্জ-৩ (সদর, শায়েস্তাগঞ্জ ও লাখাই) আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও সিলেট বিভাগ জুড়ে পরিচিত জি কে গউছ। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী কাজী মহসিন আহমেদ তুলনামূলকভাবে নবীন। এই আসনে অনেকটা হেসেখেলে জিততে পারেন জি কে গউছ।
হবিগঞ্জ-৪ (মাধবপুর ও চুনারুঘাট) আসনে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ ফয়সল। তার বিপরীতে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী আহমেদ আবদুল কাদের। তবে, বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে বেশি আলোচনায় বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের ‘তাহেরী হুজুর’ নামে পরিচিত ইসলামী বক্তা গিয়াস উদ্দিন। এরপরও এখানে এগিয়ে বিএনপি।
মৌলভীবাজার জেলা
মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা ও জুড়ি) আসনে জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বিএনপির নাসির উদ্দিন আহমেদের চেয়ে বর্তমানে এগিয়ে রয়েছেন। তবে তাদের প্রতিযোগিতায় ধীরে ধীরে হলেও এগিয়ে আসছেন জাতীয় পার্টির আহমেদ রিয়াজি উদ্দিন।
মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে বিএনপির মো. শওকতুল ইসলাম, জামায়াতের মো. সায়েদ আলী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ফজলুল হক খানের মধ্যে জমজমাট ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস দিয়েছেন সেখানকার ভোটাররা।
মৌলভীবাজার-৩ (সদর ও রাজনগর) আসনে বেশ নির্ভার আছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের ছেলে বিএনপির এম নাসের রহমান। কারণ, এখানে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আহমদ বিলালের পাশাপাশি বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে আছেন জামায়াতের আব্দুল মান্নান।
সবশেষে মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী ও বিদ্রোহী প্রার্থী মহসিন মিয়া মধু। অন্যদিকে ১১ দলীয় জোট এখানে এনসিপির প্রীতম দাশকে মনোনয়ন দিলেও মাঠে রয়ে গেছেন এই জোটেরই খেলাফত মজলিসের শেখ নূরে আলম হামিদী। অবশ্য শেষ পর্যন্ত বিএনপির মজিবুর রহমান ও বিদ্রোহী মহসিন মিয়ার মধ্যেই লড়াই হতে পারে বলছেন ভোটাররা।


