চার্লি চ্যাপলিন— বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে যে নামটি শুধু অভিনেতা হিসেবে নয়, বরং প্রতিষ্ঠান হিসেবে অমর। পুরো নাম স্যার চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন জুনিয়র। ৭৫ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি কেবল মানুষকে হাসাননি, বরং চোখের কোণে জল আর মনে প্রতিবাদের আগুনও জ্বালিয়ে দিয়েছেন।
১৮৮৯ সালের ১৬ এপ্রিল লন্ডনে এক দরিদ্র পরিবারে চ্যাপলিনের জন্ম হয়। তার বাবা চার্লস চ্যাপলিন সিনিয়র ছিলেন একজন মদ্যপ এবং পরিবারের প্রতি উদাসীন; চ্যাপলিনের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখনই তার মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে। তার মা হান্না চ্যাপলিন ছিলেন একজন মিউজিক হল পারফর্মার, কিন্তু মানসিক অসুস্থতার কারণে তাকে বারবার মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। মাত্র ৯ বছর বয়সের আগেই চ্যাপলিনকে দুবার ‘ওয়ার্কহাউসে’ (দরিদ্র আশ্রম) যেতে হয়।
চ্যাপলিনের অভিনয়ের হাতেখড়ি হয় অভাবের তাড়নাতেই। মাত্র ৫ বছর বয়সে মায়ের কণ্ঠস্বর ভেঙে গেলে তিনি প্রথমবার দর্শক মাতাতে মঞ্চে ওঠেন। এরপর ‘এইট ল্যাঙ্কাশায়ার ল্যাডস’ নামে একটি নৃত্যদলের সাথে যুক্ত হয়ে তিনি বিভিন্ন মিউজিক হলে পারফর্ম করা শুরু করেন। ১৩ বছর বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ত্যাগ করে তিনি পূর্ণাঙ্গভাবে অভিনয়ের জগতে নিজেকে সঁপে দেন।
১৯১৩ সালে ফ্রেড কার্নো কোম্পানির হয়ে যুক্তরাষ্ট্রয় সফরের সময় চ্যাপলিন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নজরে আসেন। ১৯১৪ সালে ‘কি-স্টোন স্টুডিও’-এর হাত ধরে ‘দ্য ট্রাম্প’ এর ভবঘুরে চরিত্রে অভিনয় করেন। ঢিলেঢালা প্যান্ট, টাইট কোট, ছোট হ্যাট, বিশাল সাইজের জুতো আর হাতে একটি ছড়ি— এই অদ্ভুত বেশভুষায় তিনি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন।
চ্যাপলিন কেবল একজন অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সম্পাদক এবং সুরকার। ১৯১৯ সালে তিনি ডগলাস ফেয়ারব্যাঙ্কস, মেরি পিকফোর্ড এবং ডি. ডব্লিউ গ্রিফিথের সাথে মিলে ‘ইউনাইটেড আর্টিস্টস’ নামে একটি ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি গঠন করেন। আগে অন্যদের অধীনে বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে অভিনয় করলেও এটি তাকে তার চলচ্চিত্রের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেয়।
চ্যাপলিনের শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ১৯২১ সালের ‘দ্য কিড’; যেখানে তিনি হাস্যরসের সাথে এক অনাথ শিশুর প্রতি ভালোবাসার করুণ আখ্যান বুনেছেন। এরপর ১৯২৫ সালে মুক্তি পায় ‘দ্য গোল্ড রাশ’, যেখানে পাহাড়ে বরফের মাঝে আটকে পড়া ভবঘুরে চ্যাপলিনের নিজের জুতো সেদ্ধ করে খাওয়ার দৃশ্যটি আজও সিনেমার ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে।
১৯৩১ সালের ‘সিটি লাইটস’ এবং ১৯৩৬ সালের ‘মডার্ন টাইমস’ চলচ্চিত্র দুটিতে তিনি কোনো সংলাপ ব্যবহার না করেই আধুনিক সভ্যতার যান্ত্রিকতা ও মানবিক সংকট তুলে ধরেন। বিশেষ করে ‘মডার্ন টাইমস’ ছিল যান্ত্রিক যুগে মানুষের যন্ত্রে পরিণত হওয়ার বিরুদ্ধে এক শৈল্পিক প্রতিবাদ। ১৯৪০ সালে তিনি তার প্রথম পূর্ণ সবাক চলচ্চিত্র ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ নির্মাণ করেন, যেখানে তিনি অ্যাডলফ হিটলারের ফ্যাসিবাদকে তীব্রভাবে ব্যঙ্গ করেন। সিনেমার শেষে দেওয়া তার মানবিক ভাষণটি আজও বিশ্ব শান্তির এক অনন্য দলিল হিসেবে পরিচিত।
১৯৪০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রয় চ্যাপলিনের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। তার রাজনৈতিক বিশ্বাস, বিশেষ করে বামপন্থী বা কমিউনিস্টদের প্রতি তার সহানুভূতি তাকে এফবিআই-এর নজরে আনে। তৎকালীন এফবিআই পরিচালক জে. এডগার হুভার তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালান। ১৯৫২ সালে তিনি ‘লাইমলাইট’-এর প্রিমিয়ারের জন্য লন্ডন যাচ্ছিলেন, তখন তার যুক্তরাষ্ট্রয় প্রবেশের পারমিট বাতিল করা হয়। তিনি চিরতরে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করে সুইজারল্যান্ডের ল্যাক জেনেভার পাশে মানোয়ার ডি ব্যানে সপরিবারে স্থায়ী হন।
২০ বছর পর, ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার ভুল বুঝতে পারে এবং চ্যাপলিনকে বিশেষ ‘অনারারি একাডেমি অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলে চ্যাপলিনকে ১২ মিনিট দাঁড়িয়ে সম্মান জানানো হয়, যা অস্কারের ইতিহাসে দীর্ঘতম। ১৯৭৫ সালে ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাকে ‘নাইটহুড’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
যদিও তার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সংগীতশিক্ষা ছিল না, তবুও চ্যাপলিন তিনি তার প্রায় সব চলচ্চিত্রের সুর নিজেই তৈরি করেছেন। তার তৈরি ‘স্মাইল’ গানটি আজও বিশ্ববিখ্যাত। তিনি পিয়ানো, ভায়োলিন এবং সেলো বাজাতে পারতেন।
১৯৭৭ সালের ২৫ ডিসেম্বরের ভোরে ৮৮ বছর বয়সে সুইজারল্যান্ডের নিজ বাড়িতে ঘুমের মধ্যেই চ্যাপলিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর পর তার মরদেহ চুরির মতো এক চাঞ্চল্যকর ঘটনাও ঘটেছিল, যা পরবর্তীতে উদ্ধার করে পুনরায় সমাহিত করা হয়।


