সিরাজগঞ্জে পাটের সুদিন, হাসি ফিরেছে কৃষকের মুখে

সিরাজগঞ্জে পাটের সুদিন, হাসি ফিরেছে কৃষকের মুখে
Advertisement
Advertisement

একসময় যে পাট চাষে লোকসানের আশঙ্কায় কৃষকরা জমি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, সেই পাটই এবার নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে সিরাজগঞ্জের কৃষকদের। ভালো ফলন, বাজারে চড়া দাম আর বাড়তি চাহিদায় জেলায় ফিরে এসেছে পাটের সুদিন। মাঠ থেকে হাট-সবখানেই এখন ‘সোনালি আঁশ’ ঘিরে ব্যস্ততা।

ভোরের আলো ফুটতেই সিরাজগঞ্জের খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ের পাড়ে শুরু হয় পাট ধোয়া ও শুকানোর কাজ। কোথাও বাঁশের ভেলায় পাটের আঁশ ছাড়ানো হচ্ছে, কোথাও রোদে শুকানো হচ্ছে সোনালি আঁশ। পাটকাঠি সংগ্রহ ও আঁশ বাছাইয়েও ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ও শ্রমিকরা।

জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাটের কেনাবেচায় বেশ জমে উঠেছে বেচাকেনা। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি পোড়াবাড়ী, সমোসপুর, সোহাগপুর, নলকা ও বল্লামপুর হাটেও বাড়ছে পাটের আমদানি। ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে পাট কিনে সরাসরি দেশের বিভিন্ন পাটকলে পাঠাচ্ছেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, মানভেদে মেস্তা পাট প্রতি মণ চার হাজার ৬০০ থেকে চার হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তোষা ও সাদা পাট মিলছে প্রায় তিন হাজার ৭০০ থেকে তিন হাজার ৯০০ টাকা দামে। ভালো মানের পাট বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউনিয়নের পোড়াবাড়ী এলাকার পাট ব্যবসায়ী শাহ আলম বলেন, ‘ভালো মানের পাটের চাহিদা এবার অনেক বেশি। মেস্তা কিংবা তোষা-যে জাতের পাটই বাজারে আসছে, দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে ব্যবসায়ীরাও বেশি পরিমাণে পাট কিনছেন।

ব্যবসায়ী মো. সানোয়ার খন্দকার ও আনোয়ার খন্দকার জানান, নামলা বা ইরিকাটার তুলনায় চৈতা বাইন ও আগ্গুর জাতের পাটের ফলন ও মান ভালো হয়েছে। ফলে এসব জাতের পাটে কৃষকরাও তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন।

আরও পড়ুন

কৃষকরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও উৎপাদন খরচের তুলনায় পাটের দাম কম থাকায় অনেকেই পাট চাষ ছেড়ে দিয়েছিলেন। এবার সেই চিত্র বদলেছে। ভালো ফলন ও বাজারদর তাদের আবারও পাট চাষে আগ্রহী করে তুলেছে।

সদর উপজেলার দুখিয়াবাড়ি গ্রামের কৃষক সোলায়মান বলেন, ‘একসময় দাম না পাওয়ায় পাট চাষ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কৃষি অফিসের পরামর্শে এবার আবার আবাদ করেছি। প্রতিটি গাছ ১২ থেকে ১৪ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়েছে। বিঘাপ্রতি প্রায় ১৫ মণ ফলন পেয়েছি। খরচ বাদ দিয়ে যে আয় হচ্ছে, তাতে আমরা খুশি।’

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জে প্রায় ১৪ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে তোষা, মেস্তা, বারি-১, সবুজ সোনাসহ বিভিন্ন জাতের পাট আবাদ হয়েছে। গড়ে বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১২ মণ ফলন হলেও ভালো জমিতে ফলন ১৫ মণ পর্যন্ত হয়েছে। বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ পড়েছে প্রায় ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা। বর্তমানে জাত ও মানভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে প্রায় তিন হাজার ৭০০ থেকে চার হাজার ৯০০ টাকায়।

পাটের এই সুদিন শুধু কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে না, গ্রামীণ শ্রমবাজারেও তৈরি করছে কর্মসংস্থান। পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া, শুকানো, বাছাই ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপেই কাজ করছেন শ্রমিকরা। পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমিকদেরও পাট ও পাটকাঠি শুকানো এবং বাছাইয়ের কাজে ব্যস্ত দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় পাটের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও উজ্জ্বল। পাট থেকে ব্যাগ, কার্পেট, জিও-টেক্সটাইলসহ নানা ধরনের পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি হচ্ছে। ফলে দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও পাটের চাহিদা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ কে এম মঞ্জুরে মাওলা বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ ও কৃষি বিভাগের সহযোগিতার কারণে এবার পাটের ভালো ফলন হয়েছে। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম এবং বাজারে ভালো দাম থাকায় কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে। পাট চাষের এ ধারা ধরে রাখতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত থাকবে।’

কৃষকদের প্রত্যাশা, পাটের ন্যায্য দাম, ভালো ফলন এবং বাজারব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে সিরাজগঞ্জে আবারও পাট চাষের বিস্তার ঘটবে। আর সোনালি আঁশের সেই পুরোনো ঐতিহ্য ফিরে এলে, তা বদলে দিতে পারে জেলার হাজারো কৃষক পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad