সিটি, উপজেলা ও পৌর নির্বাচন ১ বছর পেছানোর শঙ্কা

চলতি বছর ইউপি নির্বাচন আয়োজনে বিভিন্ন বাধার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা।

সিটি, উপজেলা ও পৌর নির্বাচন ১ বছর পেছানোর শঙ্কা
Advertisement
Advertisement

ব্যস্ত নির্বাচনী ক্যালেন্ডারের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন স্তর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ফলে সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার নির্বাচন আগামী এক বছরের মধ্যে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম।

ইসির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, ইউপি নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা কমিশনের নেই। আগামী বছরের জুনের মধ্যে ইউপি নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ইউপি নির্বাচন শেষ করার পর কমিশন অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করবে। ফলে ইউপি নির্বাচনের তফসিল যত পেছাবে, অন্য নির্বাচনগুলোও তত পেছাবে।’

বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ বছর ইউপি নির্বাচন আয়োজনের পথে কয়েকটি প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা। এর মধ্যে রয়েছে বার্ষিক পরীক্ষা, জাতীয় কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জনবলসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা।

এ উদ্বেগের অর্থ হলো, ইসি ইউপি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিলেও অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আরও বিলম্বিত হতে পারে।

সূত্র জানায়, ইসিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা তাদের অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন এবং চলমান কর্মসূচিগুলো বিবেচনা করে নির্বাচনের তফসিল নির্ধারণের পরামর্শ দেন।

ইসি সূত্র জানায়, বর্তমানে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ এবং ৬১টি জেলা পরিষদের নির্বাচন বাকি রয়েছে।

আগে এসব প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে শেষ হওয়ায় আলাদা সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো। এবার অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন প্রায় একই সময়ে উপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে কয়েক ধাপে এসব নির্বাচন আয়োজন করতে হবে কমিশনকে।

স্থানীয় নির্বাচন রোডম্যাপের মূল চাবিকাঠি ইউপি নির্বাচন

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসুদ বৈঠকে বলেন, অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন বাকি থাকায় ইউপি নির্বাচন দ্রুত হওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ইউপি নির্বাচনের পর সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার নির্বাচন আয়োজন করতে হবে, যার মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের জন্য ইতোমধ্যেই প্রস্তুত রয়েছে।

সভায় তিনি বলেন, ‘এসব নির্বাচন সম্পন্ন করতে যথেষ্ট সময় লাগবে।’ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে দ্রুত তাদের সুপারিশ ইসিতে পাঠানোর আহ্বান জানান তিনি।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জাতীয় নির্বাচনের মতো সব স্টেকহোল্ডারের সহযোগিতা কামনা করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত তাদের মতামত জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

আরও পড়ুন

ক্যালেন্ডারের ব্যস্ততায় ইউপি নির্বাচন আয়োজনেও বাধা

সভায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি সরকারের অগ্রাধিকারমূলক ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ কর্মসূচির বিষয়টি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ নিয়ে সরকার বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছে এবং এ বছর বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে কার্ড বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সময়ে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সভায় জানায়, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বার্ষিক পরীক্ষা চলবে।

মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি জানান, এ সময়ে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন আয়োজনের কাজে স্কুল, শিক্ষক ও কর্মচারীদেরও গুরুত্বপূর্ণ সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাই এ সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা কঠিন হবে বলে জানান তিনি।

মন্ত্রণালয় আরও জানায়, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে এসএসসি পরীক্ষা এবং জুনের শুরুতে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তাই সব বিষয় বিবেচনা করে নির্বাচনের তফসিল নির্ধারণ করা উচিত।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোও নভেম্বর ও ডিসেম্বরে নির্বাচন আয়োজন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। এ সময়ে জাতীয় দিবস, সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচি এবং নতুন নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলবে বলে তারা জানায়।

সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সভায় বলা হয়, নতুন নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ শেষ করতে আরও সময় প্রয়োজন হবে।

পরীক্ষা ও রমজানের আগে সীমিত সময়

সরকার আগামী বছরের জুনের মধ্যে ইউপি নির্বাচন শেষ করতে চাইলেও পরীক্ষা ও অন্যান্য জাতীয় কর্মসূচির কারণে ইসির হাতে সময়ের পরিসর সংকুচিত হয়ে আসছে।

সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, সব অংশগ্রহণকারী একমত হয়েছেন যে, এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগেই ইউপি নির্বাচন শেষ করতে হবে।

তবে ইউপি নির্বাচন নভেম্বর নাকি ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে বৃহস্পতিবার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

নভেম্বর-ডিসেম্বরে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে সানাউল্লাহ বলেন, ‘এটা এখন একা আমি কীভাবে বলব? প্রয়োজনীয় তথ্য আমরা পেয়েছি। এখন কমিশনে বসে নির্দিষ্টভাবে সিদ্ধান্ত নেব।’ তিনি বলেন, নভেম্বর ও ডিসেম্বরের প্রায় পুরো সময়টাই বিভিন্ন পরীক্ষায় পূর্ণ থাকে।

‘জানুয়ারিতে কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। এরপর ৭ বা ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রমজান শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রমজান শেষ হওয়ার পরপরই এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। এরপর ৬ জুন থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে,’ বলেন তিনি। ফলে নির্বাচন আয়োজনের জন্য হাতে থাকা সময় খুবই সীমিত বলে জানান তিনি।

সানাউল্লাহ বলেন, ‘এবার আমাদের সময়ের পরিসর খুবই সংকুচিত। এই সীমিত সময়ের মধ্যে সবকিছু কীভাবে সমন্বয় করা যায়, সে বিষয়ে আরও কিছু আনুষঙ্গিক কাজ করতে হবে।’

প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও বাজেট পরিকল্পনা শেষ করে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে বলে জানান তিনি।

তফসিল চূড়ান্ত করার আগে কর্মকর্তা ও সচিব পর্যায়ে সমন্বয় সম্পন্ন করবেন ইসি সচিব। এরপর কমিশনের সভায় আলোচনা করে তফসিল চূড়ান্ত করা হবে।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করতে নির্বাচন কমিশন সাত ধাপের একটি প্রাথমিক সময়সূচি ঘোষণা করার কয়েক দিনের মধ্যেই সরকারের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর তা থেকে সরে আসে।

এ ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ বিরোধী দলগুলো তীব্র সমালোচনা করে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন তোলে তারা।

২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অধিকাংশ শীর্ষ ও মধ্যম স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান শূন্য হয়ে পড়ে। এরপর থেকে এসব প্রতিষ্ঠান প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথমে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসক নিয়োগ করেছিল। পরে বিএনপি সরকার তাদের বেশিরভাগকে পরিবর্তন করে, যাদের অধিকাংশই দলটির নেতা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad