একটি রাজনৈতিক দলের জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা যেমন গৌরবের, তেমনি এটি দলের সাংগঠনিক কাঠামোর জন্য এক কঠিন পরীক্ষাও বটে। বর্তমানে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দলটির নিজস্ব সত্তা ও সাংগঠনিক ভিত যাতে দুর্বল না হয়ে পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিচালনায় অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে গিয়ে অনেক সময় দল বড় ধরনের সাংগঠনিক ক্ষতির মুখে পড়ে। এই ঝুঁকি এড়িয়ে চলাই এখন বিএনপির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশের রাজনীতিতে সরকার পরিচালনা এবং দলকে সুসংগঠিত রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সবসময়ই কঠিন। বিএনপি সরকারে থাকায় তাদের সামনে রাষ্ট্র পরিচালনা ও দলীয় সংগঠনকে শক্তিশালী রাখার দ্বৈত দায়িত্ব এসেছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, ক্ষমতায় থাকার মোহে দলীয় কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়লে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক মাশুল দিতে হয়। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও এমন বাস্তবতা দেখা গিয়েছিল, যখন দল ও সরকার প্রায় অভিন্ন হয়ে যাওয়ায় সাংগঠনিক ক্ষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতাকর্মীরা স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় কাজে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। এতে দলীয় কর্মকাণ্ডে সময় ও মনোযোগ কমে যায়। বিএনপির ক্ষেত্রেও যদি সরকার পরিচালনার ব্যস্ততায় তৃণমূল সংগঠন অবহেলিত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে দল দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। কারণ, একটি রাজনৈতিক দলের প্রাণশক্তি নিহিত থাকে মাঠপর্যায়ের সংগঠন, আদর্শিক চর্চা এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির ধারাবাহিকতায়।
দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় সাংগঠনিক ক্ষয়ের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আওয়ামী লীগ। দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকার ফলে দলটির অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। তারা নিজেদের দল নয়, বরং সরকার হিসেবে বেশি করে ভাবতে শুরু করেন। দল ও সরকারের মধ্যকার প্রয়োজনীয় পার্থক্য ক্ষীণ হয়ে যাওয়ায় সাংগঠনিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয় এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক মাশুলও গুনতে হয়। বিএনপির জন্য এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হওয়া উচিত।
অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আওয়ামী লীগের সময় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে অনেক ক্ষেত্রে দলীয় কাঠামো আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে আর তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এলেই এই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিএনপির উচিত শুরু থেকেই দল ও সরকারের মধ্যে সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব বজায় রাখা।
বিএনপির প্রথম কাজ হওয়া উচিত দলকে সরকারনির্ভর না করে সংগঠননির্ভর করে তোলা। সরকারের সাফল্য সাময়িক জনপ্রিয়তা এনে দিতে পারে, কিন্তু শক্তিশালী দলই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার ভিত্তি গড়ে দেয়। এজন্য নিয়মিত কাউন্সিল, সাংগঠনিক নির্বাচন, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয়তা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্বে আনার প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে।
একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও রাজনৈতিক দল দুটি পৃথক সত্তা হিসেবে কাজ করা বাঞ্ছনীয়। সরকার পরিচালনা করে রাষ্ট্রের আইন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। অন্যদিকে, দল কাজ করে জনগণের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা এবং রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারের জন্য। কিন্তু যখন সরকারি কর্মকাণ্ডে দলের কর্মীরা অতিরিক্ত জড়িয়ে পড়েন, তখন দলের মূল আদর্শ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এখন সফল রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি দলকে আরও সুসংগঠিত করার কাজ বিএনপিকে সমান গুরুত্ব দিয়ে চালাতে হবে।
ক্ষমতায় থাকাকালে অনেক সময় দেখা যায়, দলের পদধারী নেতারা প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যার ফলে তৃণমূলের সঙ্গে সংযোগ দুর্বল হয়ে যায়। এটি দলের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের জন্য ক্ষতিকর। তাই বিএনপির উচিত প্রতিটি স্তরে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা জোরদার করা। দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো শক্তিশালী থাকলে সরকার কোনো সংকটে পড়লেও দল তা মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।
সাংগাঠনিক কাঠামোয় সরকার ও দলের ভূমিকা স্পষ্টভাবে আলাদা রাখতে হবে। মন্ত্রী বা সরকারি পদে থাকা নেতাদের পাশাপাশি পূর্ণকালীন সংগঠক তৈরি করা জরুরি, যারা শুধুমাত্র দলীয় কাজ দেখবেন। এতে প্রশাসনিক ব্যস্ততার মধ্যেও দলীয় কার্যক্রম সচল থাকবে। একই সঙ্গে দলীয় ফোরামগুলোকে সক্রিয় রাখতে হবে, যাতে নীতিনির্ধারণে অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও মতবিনিময়ের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
বিএনপিকে আদর্শিক রাজনীতিতে নতুন করে জোর দিতে হবে। শুধু ক্ষমতা অর্জন নয়, জনগণের কাছে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মসূচি উপস্থাপন করাই একটি দলের স্থায়িত্বের মূল চাবিকাঠি। অর্থনীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষণাভিত্তিক নীতিপত্র প্রণয়ন ও প্রচার দলকে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি দেবে। এজন্য জেলা-উপজেলা সফর, কর্মী সম্মেলন এবং ডিজিটাল যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম-সবকিছুকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা উচিত।
রাষ্ট্র পরিচালনা এবং দল গঠন এই দুইয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধনই হবে বিএনপির রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয়। ‘সবাই সরকার হয়ে যাওয়া’- প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে বিএনপিকে একটি আদর্শিক ও সুশৃঙ্খল দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হওয়া উচিত। তবেই তারা যেমন সফলভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারবে, তেমনি ভবিষ্যতের যেকোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাংগঠনিক শক্তিও অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হবে।
আগেই বলা হয়েছে, ক্ষমতায় থাকা যেমন সুযোগ, তেমনি এটি একটি বড় পরীক্ষা। বিএনপি যদি কেবল সরকার পরিচালনায় মনোযোগী হয়ে দলীয় সংগঠনকে অবহেলা করে, তাহলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কিন্তু যদি তারা দক্ষ সরকার পরিচালনার পাশাপাশি শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে পারে, সেটিই হবে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের ভিত্তি। সরকার ও দলের মধ্যে ভারসাম্য, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং তৃণমূলভিত্তিক সংগঠন সময়ের দাবি। এই তিন স্তম্ভ শক্ত রাখতে পারলেই বিএনপি অতীতের ভুল এড়িয়ে টেকসই রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।


