তিন একর জমির খারিজ করতে তিন মাস ধরে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুরছেন হারুন অর রশিদ। কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামের এই বাসিন্দা বলছেন, অফিসে গেলেই তিনি শোনেন লোকের অভাব।
এই ভোগান্তি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। জেলার প্রতিটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসেই জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে সেবা। এর মধ্যে ইটনায় অনুমোদিত পদের অর্ধেকেরও বেশি শূন্য।
প্রতিটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে একজন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা, একজন উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা এবং দুইজন অফিস সহায়ক থাকার কথা। কিন্তু হারুন যে অফিসে ঘুরছেন, সেখানে এসব পদে নিয়মিত দায়িত্ব পালনের জন্য কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না।
এই অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন ইটনা সদর ইউনিয়নের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা বজেন্দ্র সূত্রধর। তিনি মাঝেমধ্যে অফিসে আসেন। এ কারণেই সবার কাজ আগাচ্ছে কচ্ছপ গতিতে।
দেশে তীব্র বেকারত্বের মধ্যে সরকারি চাকরিতেই প্রতি চারটি পদের বিপরীতে একটি ফাঁকা পড়ে আছে। এটি কেবল কর্মসংস্থানের সমস্যা নয়, একই সঙ্গে সরকারি কাজের ধীরগতিরও কারণ।
পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় সরকারি সেবা পেতে গলদঘর্ম হচ্ছে নাগরিকরা। আবার কর্মীর অভাবে একজনের কাজ কোথাও দুইজনও করতে হচ্ছে।
সরকারি কর্মচারীদের পরিসংখ্যান-২০২৫ অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছে ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন। অর্থাৎ বিভিন্ন দপ্তর, সংস্থা ও মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে ৫ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি পদ খালি, যা শতকরা হিসাবে মোট পদের ২৬ শতাংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান টাইমসকে বলেন, ‘সরকারি কোনো অফিসে গেলেই শুনবেন, তাদের লোকবলের অভাব।’
‘সরকারি কর্মচারীদের কাজ হলো সাধারণ মানুষকে সেবা দেওয়া। যদি কর্মচারীর এত পদ খালি থাকে তাহলে তো মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে না’, বলেন তিনি।
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আওয়াল মজুমদার বলেন, ‘নিয়োগ বন্ধ থাকলে সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা ঠিকমতো পান না অথবা এই সেবা পেতে দীর্ঘদিন লেগে যায়।’
এত বেশি শূন্য পদ চাকরি প্রত্যাশীদের হতাশারও কারণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২০ হাজার জন। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক: এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’ শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ২৯ শতাংশ বেকার।
পদ থাকলেও সেগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধীরগতি এই বেকারদের কর্মজীবন আরও পিছিয়ে দিচ্ছে, যা তাদের আর্থিক ও মানসিক পীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
চিকিৎসার মতো জরুরি সেবাও ব্যাহত
চিকিৎসার মতো জরুরি সেবাও আটকে থাকছে জনবল সংকটে, কখনো কখনো মানুষের মৃত্যুও হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জেরই ইটনা উপজেলার প্রজারকান্দা গ্রাম থেকে বুকে ব্যথা নিয়ে চিকিৎসা নিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছিলেন হাফিজুল রহমান। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও লোকবল না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ কোনো পরীক্ষা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তাকে ৪০ কিলোমিটার দূরে কিশোরগঞ্জ সদরের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে বলা হয়।
উপজেলার দুই লাখের কাছাকাছি মানুষের জন্য ২৭ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন কেবল ১০ জন। তবে উপজেলা স্বাস্থ্য স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বিধান চন্দ্র দেবনাথ বলেন, প্রশিক্ষণ, আদালতে সাক্ষ্য প্রদান, ছুটিসহ বিভিন্ন কারণে নিয়মিত সবাই সেবা দিতে পারেন না, নিয়মিত থাকেন পাঁচ থেকে ছয়জন।
চিকিৎসা সহায়ক কর্মীরও একই দশা। তাই ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটিতে প্রায় ৬০ বছরেও চালু করা যায়নি অস্ত্রোপচার। জনবলের অভাবে পাঠানো যন্ত্রপাতি অকেজো হচ্ছে।
কুমিল্লা সদর হাসপাতালেও একই চিত্র। সেখানে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরে পদ ফাঁকা। যে কারণে ৩৫ কিলোমিটার দূরের নাঙ্গলকোট উপজেলার বলাখাল থেকে স্ট্রোকে আক্রান্ত স্বামীকে নিয়ে এসে হতাশ হতে হয় আয়েশা আক্তারকে।
কুমিল্লার সিভিল সার্জন মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, শুধু চিকিৎসক দিয়ে ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য সহায়ক কর্মীও প্রয়োজন। কিন্তু আয়া ও মালিসহ ১১ থেকে ১৬তম গ্রেডের ২৬৮টি পদ শূন্য। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মো. শাহজাহান জানান, তাদের মালি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ অন্তত ৭৭ জন কর্মচারী প্রয়োজন। বিপরীতে আছেন ৪৪ জন।
‘প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় হাসপাতালের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়ছে’, বলেন তিনি।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্র মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে
পদ ফাঁকার দিক দিয়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্র মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো। সরকারের হিসাবে এসব প্রতিষ্ঠানে ফাঁকা পদের হার শতকরা ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ, একটি প্রতিষ্ঠানে ১০০ জনের কাজ করতে হচ্ছে ৬১ জনকে।
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়।
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধী প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৫ লাখ ১০ হাজার ৭৭১ টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৭৮ কর্মচারী কর্মরত আছে। খালি পড়ে আছে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩৮৪টি পদ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে খালি পদের হার ৩৪.৯ শতাংশ। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং বিভাগেও ২৯.৯ শতাংশ পদ খালি আছে।
সরকারের অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরে ফাঁকা পদের হার ২১ দশমিক ৩ শতাংশ।
এত পদ শূন্য কেন
লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান বলছেন, এত পদ খালি থাকার পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে; সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও প্রার্থীদের যোগ্যতা।
‘অনেক সময় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো শূন্য পদ পূরণের জন্য চাহিদাপত্র দেয়। কিন্তু সে অনুযায়ী তারা নিয়োগ দিতে পারে না। কোনো একটি প্রতিষ্ঠান হয়ত ১০০ নিয়োগ দেওয়ার জন্য চাহিদাপত্র দিল, অর্থ মন্ত্রণালয় ২০ জনকে নিয়োগ দেয়া জন্য অনুমোদন দেয়। বাকি ৮০টি পদ ফাঁকা থেকে যায়। আবার অনেক সময় দেখা, যে ধরনের যোগ্যতা দরকার তা পাওয়া যায় না বলেন।’
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আওয়াল মজুমদার মনে করেন, এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রথমত, পদ ফাঁকা থাকার পরও সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয় না। যাদের এসব উদ্যোগ নেওয়ার কথা তাদের সদিচ্ছার অভাব থাকে। এ কারণে বছরের পর বছর সরকারি নিয়োগ আটকে থাকে।’
‘আবার নিয়োগ দিলে রাজনীতি আসে অর্থাৎ নেতারা তাদের পছন্দের তালিকা দেবে এই ভয়ে অনেক সময় তা আগায় না। তৃতীয় কারণ হলো অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা তাদের নিজেদের লোক নিয়োগ দিতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দিহান থাকে। ফলে তারা এই ঝুঁকি নিতে চান না’, বলেন তিনি।
বিএনপি তার নির্বাচনি ইশতেহারে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পাঁচ লাখ শূন্য পদ পূরণের অঙ্গীকার করেছে। গত জুনে সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, তারা নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার মধ্যে শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং অধীনস্থ দপ্তর ও সংস্থাসগুলোতে তিন হাজারের মতো নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ নতুন নিয়োগের কথাও আছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী বলেন, ‘শূন্য পদে নিয়োগ দিতে সরকার ১৮০ দিনের, দুই বছরের এবং বাকিটা পরের বছরগুলোর জন্য লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। প্রথম ১৮০ দিনে ২ হাজার ৮৭৯টি শূন্য পদ পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। যার মধ্যে ইতোমধ্যে ২ হাজার ৬১টি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখন সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে তাদের শূণ্যপদ পূরণের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়োগ অবশ্য সরকারের জন্য ব্যাপক আর্থিক চাপ তৈরি করবে। সরকারি চাকরিতে বেতন শতভাগ বা তার চেয়ে বেশি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সরকার, যেটি ধাপে ধাপে আগামী দুই বছরে কার্যকর হবে।
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হলে সরকারি চাকরিতে বেতন এখনকার চেয়ে এক লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যাবে বলে জানানো হয়েছে। সব শূন্য পদ পূরণ এবং বিএনপির অঙ্গীকার অনুযায়ী নতুন পদ তৈরি হলে এই ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন কুমিল্লা থেকে মাহফুজ নান্টু ও কিশোরগঞ্জ থেকে রাকিবুল হাসান রোকেল।


