ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন/ ধানের শীষের বড় জয়, ভোটারদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ধানের শীষের বড় জয়, ভোটারদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
মির্জা ফয়সল আমীন। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীনের বড় ব্যবধানে জয় এবং ভোটের হার নিয়ে ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে বিএনপির ক্ষমতায় থাকা, উন্নয়ন প্রত্যাশা ও সংখ্যালঘু ভোটকে জয়ের কারণ হিসেবে দেখছেন।

অন্যদিকে, মাঠে ভোটার উপস্থিতি কম থাকার পরও ৬৫ শতাংশ ভোট পড়া এবং দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।

জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলেছে। তবে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করেছে বিএনপি।

শুক্রবার ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এসব প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।

জগন্নাথপুর ইউনিয়নের জেপি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেওয়া অটোরিকশাচালক রবিউল বলেন, ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি ছিল কম। তার মতে, মির্জা ফয়সল আমীন জয়ী হলেও এত বড় ব্যবধানে জেতার কথা নয়। বিএনপির অনেক ভোটারও তাকে পছন্দ করেন না। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গম আলী প্রার্থী হলে ফল বিশ্বাসযোগ্য মনে হতো।

রবিউল জানান, আগের নির্বাচনে তার কেন্দ্রে জামায়াতের প্রার্থী বড় ব্যবধানে জিতেছিলেন। এবার তার পরাজয় বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি।

গড়েয়া ইউনিয়নের ভোটার অটোরিকশাচালক তুহিনও অনিয়মের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ভোট দিতে গিয়ে ব্যালটে আগে থেকেই সিল মারা দেখতে পেয়েছেন। অনেককে ভোট দিতে না দেখলেও ভোটের হার প্রায় ৬৫ শতাংশ হওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার মতে, বিএনপি প্রার্থী জয়ী হলেও ব্যবধান এত বড় হওয়ার কথা নয়।

তবে ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) কর্মী সোহেল বলেন, নির্বাচন ভালো হয়েছে, কোনো অনিয়ম হয়নি। ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নের প্রত্যাশা থেকে মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন।

ঠাকুরগাঁও সদরের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জামায়াত নিজস্ব সমর্থকদের ভোট পেয়েছে। তবে দলটির একক ভোটব্যাংক এত বড় নয়। ভোটারদের আগ্রহ কম থাকায় আগের নির্বাচনের তুলনায় ভোট কম পড়তে পারে। তার মতে, ফলাফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মাঠে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম না থাকায় নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশ বিএনপিকে বেছে নিয়েছেন।

আরও পড়ুন

প্রথমবার ভোট দেওয়া নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থী সৈকতও মনে করেন, সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশ বিএনপির পক্ষে গেছে। তার মতে, এলাকায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমর্থক বেশি। আওয়ামী লীগকে সমর্থন করা সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশ এবার বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে ঠাকুরগাঁও শহরের একটি হোটেলের কর্মী মোহাম্মদ শাকিব ভোটের হার নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তার কাছে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়ার বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। তিনি বলেন, মির্জা ফখরুলের কাছে এক লাখের বেশি ভোটে হারলেও তার ভাই মির্জা ফয়সলের এত বড় ব্যবধানে জয় বিশ্বাস করতে পারছেন না।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ঠাকুরগাঁও শাখার সাধারণ সম্পাদক শাহ নাজমুল টাইমসকে বলেন, বিএনপি প্রার্থীর বাবা ও বড় ভাই মন্ত্রী-সংসদ সদস্য ছিলেন। দীর্ঘদিন তারা জেলার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় মির্জা ফয়সল বড় ব্যবধানে জিতেছেন। সংখ্যালঘু ভোটও তার জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সরকারি দলের প্রার্থী হওয়ায় জেলার উন্নয়ন অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা থেকেও মানুষ তাকে ভোট দিয়েছেন। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একাংশ বিএনপির পক্ষে কাজ করেছেন বলেও শোনা গেছে। অন্যদিকে, জামায়াত বিরোধী দলে থাকায় এবং সংখ্যালঘুদের ভোট না পাওয়ায় দলটির ভোট কমেছে।

জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আলমগীর হোসেন বলেন, ভোটকেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতির সঙ্গে ঘোষিত ভোটের হারের বড় পার্থক্য ছিল। গণমাধ্যমেও অনিয়মের অভিযোগ এসেছে। তার দাবি, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি, কারচুপি হয়েছে। এ অভিযোগে ভোট কারচুপি, অনিয়ম, নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও বাড়িঘর ভাঙচুরের প্রতিবাদে শনিবার বিকেলে বিক্ষোভ মিছিল করবে দলটি।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গম আলী টাইমসকে বলেন, নির্বাচনের ফল মাঠপর্যায়ে বিএনপির জনসমর্থন এবং দলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মানুষের মূল্যায়ন বুঝতে সাহায্য করেছে। তার মতে, ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল। তবে মানুষ পাশে থাকা ও তাদের জন্য কাজ করার মূল্যায়ন ভোটের মাধ্যমে করেছে। আগামী দিনে ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে। তিনি দাবি করেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে।

১৮৫ কেন্দ্রের ১৮২টিতে ধানের শীষের জয়

নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রভিত্তিক ফল অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের ১৮৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৮২টিতে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন। জামায়াতের প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন জিতেছেন তিনটি কেন্দ্রে। কেন্দ্রগুলো হলো বান্দিগড় শের-ই-বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়, দানারহাট আনছারিয়া ফাজিল মাদ্রাসা ও সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব কেন্দ্রে দেলাওয়ার যথাক্রমে ৪৭, ২৫৭ ও ৬৮১ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।

নিজের ভোটকেন্দ্র হাজীপাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়েও জয় পাননি দেলাওয়ার। সেখানে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ৬৬৭ ভোট। ধানের শীষ প্রতীকে মির্জা ফয়সল আমীন পেয়েছেন ১ হাজার ২৫০ ভোট।

পরাজিত জামায়াত প্রার্থীর বাড়িতে ফুল-মিষ্টি নিয়ে মির্জা ফয়সল

নির্বাচনে পরাজিত জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মির্জা ফয়সল আমীন। শুক্রবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে ফুল ও মিষ্টি নিয়ে হাজীপাড়ায় দেলাওয়ারের বাসায় যান তিনি। এ সময় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী কোলাকুলি করেন এবং পরস্পরকে মিষ্টিমুখ করান।

মির্জা ফয়সল বলেন, দুজনেরই জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রয়েছে। পরস্পরকে সম্মান দিয়ে তারা কাজ করবেন। তিনি দেলাওয়ারের সহযোগিতা চান।

জবাবে দেলাওয়ার বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নে তিনি সব সময় পাশে থাকবেন।

পরে সাংবাদিকদের মির্জা ফয়সল বলেন, গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত পরমতসহিষ্ণুতা। ঠাকুরগাঁওয়ের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করতে দেলাওয়ারের সহযোগিতা চাইতে এসেছেন তিনি। দেলাওয়ারও বলেন, নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন ২ লাখ ২৭ হাজার ৯১৭ ভোট পেয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৫১৩ ভোট। দুজনের ভোটের ব্যবধান ১ লাখ ৩১ হাজার ৪০৪।

ট্যাগ: ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচন, ভোটারদের প্রতিক্রিয়া, বিএনপির জয়, ভোট কারচুপির অভিযোগ

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad