নাটোরে এমপি আজিজ পরিবারের রাজত্ব, উদাসীন পুলিশ

নাটোরে এমপি আজিজ পরিবারের রাজত্ব, উদাসীন পুলিশ
Advertisement
Advertisement

ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম খুন হওয়ার পর নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আব্দুল আজিজ এবং তার দুই ছেলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, নির্যাতন, ঠিকাদারি দখল ও ক্ষমতা অপব্যবহার নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছে এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, পুলিশ সবকিছু জেনেও এই পরিবারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুরের মানুষের অভিযোগ, এমপি আজিজ ও তার দুই ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টু এবং মাহমুদুজ্জামান সোহাগ সরকারি অফিসগুলোতে সব কাজে প্রভাব বিস্তার করতেন। তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা বিলিবণ্টন ও কৃষিজমিতে জোর করে পুকুর খনন করতেন। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের জিম্মি করে রাখারও অভিযোগ আছে।

শাকিল হত্যা মামলায় মিন্টু গ্রেপ্তার হওয়ার পর এসব তথ্য সামনে আসে। এলাকার মানুষ ও স্থানীয় বিএনপির নেতারা এতদিন ভয়ে এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা না বললেও এখন তারা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, এই পরিবারের চাঁদাবাজি ও ঠিকাদারি দখলের কারণে পুরো এলাকায় প্রচণ্ড ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মিন্টু নিজের কাজে বাধা পেলে সরকারি কর্মকর্তাদের হুমকি দিতেন। এমনকি ঠিকাদারি কাজ পেতে ইঞ্জিনিয়ারদের বন্দুকের মুখে ভয় দেখাতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। একবার একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) তার অফিসের ভেতরে আটকে রেখেছিলেন মিন্টু।

এতসব গুরুতর অভিযোগ থাকার পরও এতদিন মিন্টু ছিলেন আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এমপির ছোট ছেলে সোহাগের বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন কাজ এবং টিআর, কাবিখা ও জিআর-এর মতো ত্রাণ ও অনুদানের বরাদ্দ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি সার ডিলার নিয়োগেও এই পরিবারের পক্ষ থেকে স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে।

স্থানীয়দের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিযোগ, এই পরিবার একটি ‘টর্চার সেল’ চালাত। সেখানে লোকজনকে বেঁধে রেখে মারধর ও সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া হতো।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে নির্যাতনের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া মিন্টু গ্রেপ্তার হওয়ার পর এমপি আজিজ ও এক নারীর একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যার ফলে এমপির নৈতিক চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে এমপি আজিজ টাইমসকে বলেন, তিনি বা তার ছেলেরা কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন। তার দাবি, রাজনৈতিক শত্রু এবং দলের মনোনয়ন না পাওয়া মানুষেরা তার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে।

আলোচনায় ‘ছাটা গ্রুপ’

গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম প্রতিপক্ষের হামলায় গুরুতর আহত হন। প্রায় ১২ দিন জীবন-মৃত্যুর লড়াই করার পর গত ২৬ অক্টোবর তিনি মারা যান।

তার এই মৃত্যুর পর স্থানীয় একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ‘ছাটা গ্রুপ’ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এলাকার মানুষের অভিযোগ, মিন্টুর মদদেই এই গ্রুপটি চলে।

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী যুবলীগের সাবেক নেতা রাসেল ইসলাম এই গ্রুপের প্রধান বলে অভিযোগ রয়েছে। মিন্টুর আশীর্বাদেই রাসেল ও তার লোকজন এলাকায় দাপট দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন।

শাকিলের বাবা রবিউল ইসলাম অভিযোগ করেন, তার ছেলেকে এই গ্রুপের লোকজনই খুন করেছে। তিনি জানান, শাকিলকে হারানোর পরেও তাদের পরিবার এখনো চরম আতঙ্কে আছে।

শাকিলের বোন শাকিলা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা আমাদের ভাইকে হারিয়েছি। আর কাউকে হারাতে চাই না।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বাসিন্দা জানান, রাসেলের সঙ্গে জেমস নামের এক ব্যক্তির ঝামেলা চলছিল।

জেমসকে খুনের একটি পরিকল্পনা করা হয়, যার প্রতিবাদ করেছিলেন শাকিল। আর এ কারণেই রাসেল ও মিন্টুর সঙ্গে শাকিলের শত্রুতা তৈরি হয়। এলাকাবাসীর সন্দেহ, এই বিরোধের জেরেই শাকিল খুন হয়েছেন।

রাসেল এমপি আজিজ ও তার দুই ছেলেকে আইফোন উপহার দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করে এলাকাবাসী।

চাঁদাবাজি ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ

এমপি হওয়ার আগে আজিজ ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গুরুদাসপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। তার আগে তিনি ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিজের এই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষমতা খাটিয়ে তিনি ও তার পরিবার দুই উপজেলায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।

গত ৫ আগস্টের পর থেকে তার ছেলেরা ব্যবসায়ী ও সার ডিলার সমিতির কাছ থেকে জোর করে চাঁদা তুলতেন।

মিন্টুর বিরুদ্ধে সরকারি কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া, অস্ত্র দেখিয়ে ইঞ্জিনিয়ারদের ভয় দেখানো এবং কৃষিজমিতে অবৈধ পুকুর কাটার অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে, এক ইউএনওকে হুমকি দিয়ে তার অফিসের দরজায় তালা লাগিয়ে আটকে রাখার ঘটনায় তিনি দেশজুড়ে আলোচনায় এসেছিলেন।

তার বিরুদ্ধে ‘টর্চার সের’ চালানোর অভিযোগও রয়েছে, যেখানে মানুষকে বেঁধে নির্যাতন করা হতো।

এমপির ছোট ছেলে সোহাগের বিরুদ্ধে সরকারি প্রজেক্টের ঠিকাদারি কবজা করে রাখার অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ মানুষের দাবি, সোহাগের পছন্দ ছাড়া কোনো ঠিকাদার কাজ পেতেন না। অন্য কেউ কাজ পেলেও তাকে জোর করে সোহাগের পছন্দের মানুষের কাছে কাজ হস্তান্তর করতে হতো অথবা মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হতো।

ত্রাণ ও অনুদানের টাকা তুলতে গিয়ে কোনো কাজ না করেই পুরো টাকা তুলে নেওয়ার এবং তার ৩০ শতাংশ টাকা সোহাগের পকেটে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

চলনবিলের নদী ও খালে বড় মাছ ধরার জন্য অবৈধ স্রোতি জাল পেতেছিলেন সোহাগ। এই জালের কারণে ছোট মাছ ও মাছের ডিম নষ্ট হচ্ছে, আটকে যাচ্ছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। পানি ঠিকমতো নামতে না পারায় কৃষিকাজও নষ্ট হচ্ছে, অথচ প্রশাসন কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না।

সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি

সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই পরিবারের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, এমপির সুপারিশে মিন্টু নিজে, তার দুই ভাইয়ের স্ত্রী এবং যুবদল নেতা বাশার হত্যা মামলার এক আসামি সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন।

গুরুদাসপুর থানা বিএনপির সমন্বয়ক আবু হেনা মোস্তফা কামাল রানু টাইমসকে জানান, মিন্টুকে এলাকার মানুষ ‘উত্তরবঙ্গের ইয়াবা বদি’ নামে চেনে।

তিনি অভিযোগ করেন, মিন্টু ও সোহাগ সবসময় অস্ত্র নিয়ে ঘুরতেন এবং চাঁদাবাজি ও ঠিকাদারি দখল করতেন। আর দুই ভাইদের সব অন্যায় কাজে সাহায্য করত পুলিশ প্রশাসন।

মানুষের মনে চরম আতঙ্ক

এমপি ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে এত অপরাধের অভিযোগ থাকলেও মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। কেউ প্রতিবাদ করলে হামলা বা হয়রানির শিকার হতে হয়।

শাকিল খুন হওয়ার পর এই আতঙ্ক আরও বেড়েছে। নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছে তার পরিবারের সদস্যরা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, সরকার বদলের পর থেকেই আজিজ ও তার ছেলেরা এলাকায় ভয়ের রাজত্ব চালাচ্ছেন, কিন্তু পুলিশ বারবার অভিযোগ পেয়েও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

এদিকে নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরিফুল হক জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর এমপি বা তার ছেলেদের বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তার কাছে আসেনি।

তিনি বলেন, অপরাধী যারাই হোক এবং তারা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, ছাড় দেওয়া হবে না।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad