রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারুফ ওরফে দুখু মিয়া (১৮) নিহত হওয়ার ঘটনায় এসআরবির অভিযানে অংশগ্রহণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে অসংগতি দেখা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। তবে মারুফ কার গুলিতে নিহত হয়েছেন, তা নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
মারুফ দয়াগঞ্জের একটি অ্যালুমিনিয়ামের পাতিল তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট।
মারুফের খালাতো বোন বিথী আক্তার জানান, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় কাজ শেষে বাসায় ফেরেন মারুফ। কিছুক্ষণ পর স্ত্রী মিমকে অল্প সময়ের জন্য বাইরে যাওয়ার কথা বলে বের হন তিনি। পরে লোকমুখে জানতে পারেন, ওয়াসা গেটে গুলির ঘটনা ঘটেছে। সেখানে মারুফ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশের দাবি, রাতে ধলপুরে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে যায় এসআরবির একটি দল। এ সময় আটক এক সন্দেহভাজনকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হলে এসআরবি সদস্যদের সঙ্গে কথিত মাদক কারবারিদের গোলাগুলি হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হন মারুফ।
এসআরবির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, প্রায় ১০০ জন কথিত মাদক কারবারি এসআরবি সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের মুঠোফোন ও টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। হামলাকারীরা সদস্যদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে তারা ফাঁকা গুলি ছোড়েন।
তবে এসআরবি-১০ লালবাগ ক্যাম্পের উপসহকারী পরিচালক হুমায়ুন আহমেদ ওই এলাকায় অভিযান চালাতে কোনো দল পাঠানোর কথা অস্বীকার করেন। ফলে অভিযানে এসআরবি সদস্যদের উপস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে অসংগতি দেখা দিয়েছে।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার পৃথক দুটি মামলা করেছে এসআরবি-১০। প্রথম মামলায় চারজনকে আসামি করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১) ধারায় মাদক রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে। দ্বিতীয় মামলায় ওই চারজনসহ অজ্ঞাতনামা ১২০ থেকে ১৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এতে হামলা, মারধর, সরকারি কাজে বাধা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। মামলাটি দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৪, ১৮৬, ৩৩২, ৩৫৩, ৩০৭ ও ৩৪ ধারায় করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, এসআরবি সদস্য পরিচয়ে ছয়জন ধলপুরের সিটি পল্লী মাঠে গিয়ে তিনজনকে হাতকড়া পরান। একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন তাদের লক্ষ্য করে ইটের টুকরা ছুড়লে দুই ব্যক্তি গুলি চালান। এ সময় মারুফ গুলিবিদ্ধ হন বলে দাবি করেন এক প্রত্যক্ষদর্শী।
নিহতের চাচাতো বোন বিথী আক্তারের দাবি, কালো প্যান্ট ও কালো টি-শার্ট পরা কয়েকজনকে তিনি মারুফকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে দেখেছেন। বিথীর ভাষ্য, মারুফ ক্রিকেট খেলতে মাঠে গিয়েছিলেন। দুই পক্ষের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন।
মারুফের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। বৃহস্পতিবার সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলামের সই করা বিবৃতিতে এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও সংগঠনটির নিজস্ব অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে গুরুতর অসংগতি পাওয়া গেছে। একদিকে অভিযানের সময় আত্মরক্ষার্থে ফাঁকা গুলি ছোড়ার দাবি করা হয়েছে, অন্যদিকে এসআরবির একটি ক্যাম্প থেকে ওই এলাকায় কোনো দল পাঠানোর কথা অস্বীকার করা হয়েছে। মারুফ কার গুলিতে নিহত হয়েছেন, তা-ও নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এইচআরএসএসের অনুসন্ধানে নিহতের স্বজনদের বরাতে বলা হয়েছে, হট্টগোলের শব্দ শুনে মারুফ পাশের রাস্তায় গেলে কিছুক্ষণ পর তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, এসআরবি সদস্য পরিচয় দেওয়া কয়েকজন তিনজনকে হাতকড়া পরানোর সময় ইটের টুকরা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এ সময় দুই সদস্য গুলি চালান। এসব বক্তব্যের অসংগতি নিরসনে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি বলে মনে করে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির সরকার অনুমতি দিলে ‘ক্রসফায়ার’ করার প্রস্তুতি রয়েছে বলে মন্তব্য করার এক দিন পর এ ঘটনা ঘটে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের বক্তব্য উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) নাম পরিবর্তন করে এসআরবি করা হলেও কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এইচআরএসএস।
সংগঠনটি বলেছে, বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ ও নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ৬ অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকার সুরক্ষিত। জাতিসংঘের নীতিমালা অনুযায়ী, আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার কঠোরভাবে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রাণহানির ঘটনায় কার্যকর, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে সাত দফা দাবি জানিয়েছে এইচআরএসএস। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বাইরে স্বাধীন তদন্ত করে ফলাফল প্রকাশ, ব্যালিস্টিক পরীক্ষা ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন সংগ্রহ, সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড ও অভিযানসংক্রান্ত নথি সংরক্ষণ এবং তদন্তে ব্যবহার। তদন্তের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার, আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, নিহতের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দায়ীদের বিচার এবং পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও কার্যকর প্রতিকার দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিতবাহী বক্তব্য প্রত্যাহার, অভিযান পরিচালনা, সদস্যদের পরিচয় প্রদর্শন ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং এসআরবির কাঠামোগত সংস্কার, স্বাধীন তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে এইচআরএসএস।


