চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশব্যাপী নিরস্ত্র শিক্ষার্থী, বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক ও পদ্ধতিগত আক্রমণের ঘটনায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং তাদের রাজনৈতিক মিত্র ১৪ দলীয় জোটকে ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন হিসেবে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
নিপীড়নের অভিন্ন নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পরিকল্পিতভাবে এসব আক্রমণ চালানো হয়েছিল বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে ট্রাইব্যুনাল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফসহ দলের চার নেতার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ে এ পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করে। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায়ে হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সদর উদ্দিন খান, জেলা সাধারণ সম্পাদক মো. আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আতাউর রহমান আতাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
আসামিদের স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তি জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। চার আসামিই পলাতক।
পঞ্চম অভিযোগে ‘অভিন্ন অভিপ্রায় ও অপরাধমূলক সংগঠন’ প্রসঙ্গে বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে নিপীড়নের অভিন্ন নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও তাদের রাজনৈতিক মিত্র ১৪ দলীয় জোট দেশব্যাপী সম্মিলিতভাবে পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত হামলা চালায়। এসব হামলা ব্যাপক ও পদ্ধতিগত আক্রমণের অংশ ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
রায়ে বলা হয়, হানিফসহ আসামিরা ওই সাংগঠনিক কাঠামোর অংশ হিসেবে জেনেশুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে নিপীড়নের অভিন্ন নীতি বাস্তবায়নে কাজ করেছেন। এর মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২)(এ) ও ৪(১) ধারার অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন।
আসামিদের বিরুদ্ধে যৌথভাবে ও পৃথকভাবে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র, উসকানি, অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা এবং বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত ব্যাপক ও পদ্ধতিগত আক্রমণে অংশগ্রহণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। এ অভিযোগে আসামিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব অপরাধ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩(২)(এ), ৩(২)(জি), ৩(২)(এইচ), ৪(১), ৪(২) ও ৪(৩) ধারার অধীনে পড়ে এবং ২০(২) ও ২০এ ধারায় শাস্তিযোগ্য।
প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম টাইমসকে বলেন, মামলার পঞ্চম অভিযোগে ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’ বা অভিন্ন অপরাধমূলক উদ্দেশ্য এবং অপরাধমূলক সংগঠনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগ গঠনের সময় ট্রাইব্যুনাল বলেছিল, দেশব্যাপী ব্যাপক ও পদ্ধতিগত আক্রমণের মাধ্যমে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ছিল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পরিকল্পনার অংশ, যা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও ১৪ দলীয় জোট বাস্তবায়ন করেছে।
তামিম বলেন, ট্রাইব্যুনালে এ অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং চার আসামিকেই এ অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও ১৪ দলীয় জোটকে অপরাধমূলক সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে।


