বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তাকে বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া পরিচিত ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের বক্তব্যে একাধিক অসংগতি পেয়েছেন কর্মকর্তারা। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোটরসাইকেল উদ্ধার হলেও তাহসিফের শেষ মুহূর্তে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তা প্রকাশ করা হচ্ছে না।
তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দিয়েছেন বলে দীপ যে এলাকার কথা জানিয়েছেন, সেখানকার বেশ কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে।
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার রাতে কী ঘটেছিল, কেন দীপ একা ফিরে এসেছিলেন, এসব বিষয়ে একেক সময় একেক তথ্য দিচ্ছেন তিনি। ঘটনাস্থলে পুলিশের মতো দেখতে দুইজনকে দেখে পালানোর দাবি, নিখোঁজ মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং মৃত্যুর আগে শেষ মুহূর্তের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার হলেও সেটি কীভাবে ঘটনাস্থলের কাছে এল, কারা তাকে ও তাহসিফকে ধাওয়া করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে তাহসিফ তুরাগ নদে গেলেন, সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলছে, প্রতিটি তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে তাহসিফকে হত্যা করা হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার রাতে উত্তরার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন তাহসিফ। বুধবার বিকালে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ।
তার মোটরসাইকেলটির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। শুক্রবার সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি কালো মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পিবিআই। তাহসিফ যে মডেলের মোটরসাইকেল ব্যবহার করতেন, এটিও সেই মডেলের। তবে মোটরসাইকেলটির মালিকানা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পায়নি পিবিআই।
দীপের বক্তব্যে ধারাবাহিকতা নেই
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে দীপ বলেছিলেন, তারা প্রথমে একটি মোটরসাইকেলের ওয়ার্কশপে যান। সেখান থেকে পরে রুয়াপ কমপ্লেক্সে গিয়ে একটি রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খান। খাওয়া শেষে তারা আলাদা হয়ে যান। দীপ নিজের কাজে চলে যান এবং পরে বাসায় ফেরেন। তার দাবি ছিল, রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত তারা একসঙ্গে ছিলেন।
কিন্তু পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপের বক্তব্যে ভিন্ন তথ্য উঠে আসে। পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানান, দীপ বলেছেন, তারা ঘটনাস্থলে কথা বলছিলেন। এ সময় কয়েকজন তাদের ধাওয়া করেন। তখন তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন এবং দীপ সেখান থেকে পালিয়ে যান।
দুই বক্তব্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় দীপের দেওয়া তথ্য যাচাই করছেন তদন্তকারীরা। বিশেষ করে রাত ১২টার দিকে হাউস বিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা বলার পর রাত ২টার দিকে কেন তারা আবার ওই এলাকায় গেলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার দুপুরে দীপকে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান পিবিআই সদস্যরা। তাহসিফ ওই এলাকাতেই নদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন দীপ।
পিবিআইয়ের এক পুলিশ সুপার জানান, ওই এলাকা ‘মাদকস্পট’ হিসেবে পরিচিত।
তিনি বলেন, দীপ তাদের জানিয়েছেন, সেদিন রাতে পুলিশের একটি দল তাদের ধাওয়া দিলে তিনি বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে লুকান। আর তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন। পরে দীপ সেখান থেকে চলে যান এবং রাত আড়াইটার দিকে বাড়িতে ফেরেন।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, দীপ দাবি করেছেন, মঙ্গলবার রাতে তুরাগ নদের তীরে পুলিশের মতো দেখতে দুইজনকে দেখে তারা দৌড় দেন। ওই ব্যক্তিরা আসলেই পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না, তারা ইউনিফর্ম পরা ছিলেন কি না কিংবা কোনো দায়িত্বে সেখানে গিয়েছিলেন কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
দীপের দেওয়া কোনো তথ্যই যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করা হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রকৃত সত্য জানার জন্য তদন্ত করছি। তারা ওইখানে কেন গিয়েছিল, তাকে কেউ হত্যা করেছে নাকি দুর্ঘটনা, নাকি আত্মহত্যা, এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজছি।’
এনায়েত হোসেন মান্নান আরও বলেন, ‘দীপ আগের দিন জানিয়েছিলেন, রাত ১২টার দিকে হাউস বিল্ডিং এলাকা থেকে তারা আলাদা হয়ে দুদিকে চলে যান। এরপর তাদের মধ্যে আর যোগাযোগ হয়নি। তাহলে রাত ২টার দিকে তারা কেন ওই এলাকায় এসেছিলেন এবং গভীর রাতে মোটরসাইকেল নিয়ে সেখানে যাওয়ার কারণ কী, তা তদন্ত করা হচ্ছে।’
টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরাও শুনেছি, পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। পুলিশের কোন টিম তাদের ধাওয়া দিয়েছিল, কেন ধাওয়া দিয়েছিল, আমরা সেগুলো খতিয়ে দেখছি।’
তাহসিফ ছিলেন দক্ষ সাঁতারু
তাহসিফ পানিতে ডুবে যাবেন, তা বিশ্বাস করতে পারছেন না তার বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম। ধাওয়ার মুখে নদে ঝাঁপ দেওয়ার তথ্যও মানতে নারাজ তিনি। তার দাবি, ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে সাঁতার জানত। ও তো পাইলট। ওদের সুইমিংয়ের কোর্স করা এবং তার ওপর সার্টিফিকেট আছে।’
ঘটনা আড়াল করা কিংবা কোনো ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে তো এটাই মনে হয়। তো আর ওকে ধাওয়া দেবে কেন লোকজন, কেন তাকে কেউ ধাওয়া দেবে? ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
মামলা করবে নৌ-পুলিশ
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা করা হয়নি। তার বাবা বলেন, ‘পারিবারিকভাবে আমরা এটা আলোচনা করব, এরপর সিদ্ধান্ত নেব।’
মামলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘এখানে সরকার নিশ্চয় দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবে এবং অত্যন্ত আন্তরিক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
নৌ-পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম জানিয়েছিলেন, পরিবার মামলা না করলে পুলিশ নিজেই মামলা করে আইনি ব্যবস্থা নেবে।
উত্তরখান থানার ওসি মো. হাবিব বলেন, ‘আমি তাহসিফ সউরির বাবাকে ফোন দিয়েছিলাম থানায় এসে মামলা করার জন্য। এখন পর্যন্ত আমাদের থানায় মামলা হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
এদিকে, বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির ব্যবসায়িক অংশীদার ও বন্ধু শাহরিয়ার রেজা দীপকে নৌ-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে পিবিআই। শনিবার মধ্যরাতে তাকে হস্তান্তর করা হয়।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, পরিবার মামলা করতে আগ্রহী না হওয়ায় তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা করবে নৌ-পুলিশ।


