নিজের সর্বস্ব দিয়ে মেয়েদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন রেখা রাণী

নিজের সর্বস্ব দিয়ে মেয়েদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন রেখা রাণী
রেখা রাণী। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন রেখা রাণী ওঝা। জীবনের স্রোত তাকে নিয়ে গেছে নার্সিং পেশায়। সরকারি হাসপাতালে সেবিকা হিসেবে কর্মজীবন কাটিয়েছেন। তবে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন কখনো ছাড়েননি। চাকরি থেকে অবসরের পর জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে গড়ে তুলেছেন মেয়েদের একটি স্কুল।

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার ৭৭ বছর বয়সী রেখা রাণীর স্কুলের নাম ‘কুমারী রেখা রাণী গার্লস হাই স্কুল’। জমি কেনা, টিনশেড ঘর নির্মাণ, পরে বহুতল ভবন গড়তে ব্যয় করেছেন চাকরির আয় ও অবসরকালীন সব সুবিধার টাকা।

স্কুলটিতে পড়ছে স্বল্প আয়ের পরিবারের মেয়েরা। তাদের স্বপ্ন পূরণের পথ দেখাতে চান রেখা। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আমি অধ্যাপক হতে চেয়েছিলাম, পারিনি। বড় কোনো পদেও যেতে পারিনি। কিন্তু আমার একজন ছাত্রী হয়তো একদিন শিক্ষক হবে, আরেকজন ডাক্তার হবে, কেউ সরকারি কর্মকর্তা হয়ে নিজের পরিবারকে টেনে তুলবে, সমাজের জন্য কাজ করবে। আমার কাছে এটাই সাফল্য।’

জীবনের শেষ প্রান্তে অসুস্থ শরীর নিয়ে রেখার একটাই আকুতি, তিনি না থাকলেও যেন তার গড়া মেয়েদের স্কুলটি টিকে থাকে।

১৯৪৮ সালে দরিদ্র পরিবারে জন্ম রেখার। পড়াশোনার প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হওয়ার কিংবা এমন কোনো পেশায় যাওয়ার, যেখানে মানুষের জন্য কাজ করা যায়।

কিন্তু আর্থিক সংকটে বারবার বাধা এসেছে। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে রেখা ছিলেন সবার বড়। কিশোর বয়সে একাধিকবার তার বিয়ের চেষ্টা হয়েছে। বাবা শশি ভূষণ ওঝা পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন। তবে রেখার জেদের কাছে পেরে ওঠেননি।

পড়াশোনা চালিয়ে যেতে কখনো বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ঢাকার নার্সিং ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। নার্সিংকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন।

১৯৮৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন রেখা। পরে সরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালে মিরপুরের ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল থেকে অবসরে যান।

রেখা বিয়ে করেননি। চাকরিজীবনে প্রতি মাসে আয়ের একটি অংশ জমাতেন। অবসরকালীন সুবিধার টাকা যোগ করে জমি কেনেন। ২০১৪ সালে কোটালীপাড়ার বুরুয়া গ্রামে একটি ছোট টিনশেড ঘরে শুরু করেন স্বপ্নের স্কুল। প্রথমে ছাত্রী ছিল মাত্র একজন।

আরও পড়ুন

ধীরে ধীরে বড় হয়েছে স্কুলটি। এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাসের সুনামও অর্জন করেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারি অর্থায়নে বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। চলতি বছর শেষ হয়েছে কাজ।

বর্তমানে স্কুলে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। চলতি শিক্ষাবর্ষে ছাত্রী ১০০ জন, শিক্ষক সাতজন। ছাত্রীদের জন্য রয়েছে আবাসিক ব্যবস্থাও।

শুরুতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রী খুঁজেছেন রেখা। দরিদ্র অভিভাবকদের মেয়েদের বিয়ে না দিয়ে স্কুলে পাঠাতে বুঝিয়েছেন। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বোঝান, একটি মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হলে তার সামনে সম্ভাবনার অনেক দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তার কথায় ভরসা পেয়ে অনেক পরিবার মেয়েদের স্কুলে পাঠিয়েছে। তাদের কেউ কেউ বাড়ির বদলে স্কুলের আবাসনে থাকে।

স্কুলের বেশির ভাগ ছাত্রী দরিদ্র পরিবারের। ভর্তির সময় অভিভাবকেরা সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা দেন। পরীক্ষার সময় সরকারি নিবন্ধন ফি ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত বেতনও নেওয়া হয় না। আবাসিক ছাত্রীদের খাবারের খরচ মেটাতে অভিভাবকেরা সহযোগিতা করেন। কেউ শাকসবজি পাঠান, কেউ চাল বা ডাল দেন।

নিজের ঘর নেই, লাইব্রেরিই আশ্রয়

রেখার রয়েছে নানা স্বাস্থ্যগত জটিলতা। ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরেও যেতে হয়েছে তাকে। নিজের জন্য জমানো অর্থ প্রায় শেষ। এখন স্কুলের লাইব্রেরির এক কোণে থাকেন তিনি।

নিজের সুখ-দুঃখের কথা বলতে চান না রেখা। তার ভাষায়, ‘আমার জীবনটা কষ্টের, আর সেই কষ্টের কথা শুনে কী করবেন? তার চেয়ে আমার স্কুলটির কষ্ট যাতে দূর হয়, তেমন কিছু করুন।’

স্কুলের বড় সংকট অর্থের অভাব। বহু বছরেও সরকারি এমপিওভুক্তির আওতায় আসেনি প্রতিষ্ঠানটি। ফলে শিক্ষকদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বেতন-ভাতার সংকটে অনেক শিক্ষক চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

রেখার এই দুশ্চিন্তার কথা জেলা প্রশাসনের কাছেও পৌঁছেছে। গত ২৭ আগস্ট গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ স্কুলটি পরিদর্শন করে আর্থিক সহায়তা দেন। তার দপ্তরের দায়িত্বের বাইরে হলেও স্কুলটি এমপিওভুক্ত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার আশ্বাস দেন।

গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান জানান, তার নির্দেশে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্কুলটি পরিদর্শন করেছেন। শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ ও উপযোগী পরিবেশ তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হতে পারে।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘রেখা রাণীর মহতী উদ্যোগকে আমি স্যালুট করি। সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষ যদি তার মতো করে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসেন, তাহলে শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।’

বিয়ে না করেও মাতৃত্বের স্বাদ

বিয়ে না করলেও রেখার জীবনে মাতৃত্ব এসেছে অন্যভাবে। চন্দনা রানী বৈদ্য নামে এক মেয়েকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

চন্দনার মা মারা যাওয়ার পর তার বাবা আবার বিয়ে করেন। নতুন সংসারে ঠাঁই হয়নি শিশুটির। তখন চন্দনাকে নিজের কাছে নিয়ে মেয়ের মতো বড় করেন রেখা।

চন্দনা সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেছেন। এখন চাকরি খুঁজছেন। পাশাপাশি টিউশনি করেন এবং স্কুল পরিচালনায় মাকে সহযোগিতা করেন।

চন্দনা বলেন, ‘কখনো ঘরে বাজার থাকে না। জমির শাকপাতা তুলে আলুভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে দিন কাটে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad