সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সায়দাবাদ ইউনিয়নের খিদির বটতলা বাসিন্দা রাজেন্দ্রনাথ সরকার ও তার স্ত্রী করিবালা সরকারের সংসারে ছয় মেয়ে। তবে তাদের ষষ্ঠ মেয়ে কোনো মানুষ নয়, একটি বটগাছ। নাম তার বটেশ্বরী আর মেয়ে জামাই বটেশ্বরীর পাশের পাকুড়গাছ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে সংসার করছে বটেশ্বরী আর পাকুড় গাছ। প্রতিবছর বটেশ্বরীর জন্য আসে নতুন শাড়ি আর পাকুড়গাছের জন্য ধুতি। সপ্তাহে তিন দিন হয় পূজা- অর্চনা, দেওয়া হয় দুধ-কলা ও নানা রকম ভোগ। মানত পূরণের আশায় কেউ বাঁধেন লাল সুতো, কেউ ঝুলিয়ে রাখেন তাবিজ আবার কেউ উপহার নিয়ে ছুটে আসেন দূর-দূরান্ত থেকে।
রাজেন্দ্রনাথ-করিবালা দম্পতি জানান, ২০১০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করা হয় বটেশ্বরী ও পাকুড়গাছকে। সেই থেকে কেটে গেছে ১৬ বছর। স্থানীয়দের বিশ্বাস, গাছ দুটি আজও স্বামী-স্ত্রী, আর তাদের ঘিরেই চলছে নানা আচার-অনুষ্ঠান।
এই ব্যতিক্রমী বিয়ের পেছনে রয়েছে একটি স্বপ্ন, একটি পরিবারের দুশ্চিন্তা এবং গ্রামবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগের গল্প।
রাজেন্দ্রনাথ-করিবালার মেয়ে মুক্তি সরকারের বিয়ের আগে এক রাতে স্বপ্ন দেখেন রাজেন্দ্রনাথ। তার ভাষায়, ‘স্বপ্নে বটেশ্বরী ও পাকুড়গাছ এসে আমাকে বলে, মুক্তির বিয়ের আগেই যেন তাদের দুজনের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সেই স্বপ্নকে গুরুত্ব না দিয়ে আমি প্রথমে মেয়ের বিয়ে দেই।’
একপর্যায়ে স্বপ্নের বিষয়টি তিনি পরিবারের সদস্য ও গ্রামবাসীকে জানান। পরে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে বটেশ্বরী ও পাকুড়গাছের বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মুক্তি সরকারের স্বামী দিরেশ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘মুক্তির সঙ্গে আমার বিয়ের পরে আমার শ্বশুর ও গ্রামবাসীর সহযোগিতায় বটগাছ ও পাকুড়গাছের বিয়ে দেওয়া হয়।’

গাছ দুটিকে ঘিরে পরিবারের আবেগের কথা বলতে গিয়ে করিবালা সরকার বলেন, ‘আমাদের আগে পাঁচ মেয়ে ছিল, এখন ছয় মেয়ে। বটেশ্বরী আমার মেয়ে। তাদের বিয়ের সময় এত মানুষের সমাগম হয়েছিল যে, লোকজন সামাল দিতে পুলিশ পর্যন্ত এসেছিল। পুলিশ এসে আমাদের সহযোগিতা করেছিল।’
একটি গাছকে নিজের মেয়ের মতো করে দেখার এই অনুভূতিই যেন বটেশ্বরীকে ঘিরে পরিবারের আবেগকে আরও গভীর করেছে। স্থানীয়দের কাছেও বটেশ্বরী কেবল একটি গাছ নয়; দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক পরিচিত নাম।
একই গ্রামের বাসিন্দা উপেন্দ্রনাথ অধিকারী বলেন, ‘রাজেন্দ্রনাথের স্বপ্নের কথা শোনার পর আমরা সবাই একত্রিত হই। এরপর গ্রামবাসীর সহযোগিতায় এখানে বটগাছ ও পাকুড়গাছের বিয়ে দেওয়া হয়। সেই থেকে তারা এভাবেই রয়েছে।’
একই গ্রামের সুশান্ত সরকার বলেন, ‘আমি নিজেও তাদের বিয়ের আয়োজনের সঙ্গে ছিলাম। এখানে সপ্তাহে তিন দিন ভোগ দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন ধরনের পূজা-অর্চনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই রীতি চলে আসছে।’
আরেক বাসিন্দা বাদল সরকার বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন এখানে আসেন। তারা গাছ দুটিকে দেখেন, মানত করেন এবং নানা ধরনের উপহার দেন।’
পরিবার ও গ্রামবাসীর মতে, বটেশ্বরী ও পাকুড়গাছের বিয়ে যদিও পরিবারটির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের বিষয়, তবু সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এলাকায় গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের এক ব্যতিক্রমী লোকাচার।
প্রতিবছর বটেশ্বরীকে শাড়ি উপহার দেওয়া হয়, আর পাকুড়গাছের জন্য আনা হয় ধুতি। সপ্তাহে তিন দিন পূজা-অর্চনার পাশাপাশি দেওয়া হয় দুধ-কলা ও বিভিন্ন ধরনের ভোগ। বিয়ে, পূজা কিংবা অন্য কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রতীকীভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয় গাছ দুটিকে।

মনোবাসনা পূরণের আশায় অনেকে বটেশ্বরীর গায়ে বাঁধেন লাল সুতো, ঝুলিয়ে রাখেন তাবিজ কিংবা করেন মানত। কেউ আসেন কৌতূহল নিয়ে, কেউ আবার নিজের বিশ্বাস থেকে উপহার নিয়ে হাজির হন। এভাবেই সময়ের সঙ্গে খিদির বটতালার এই স্থানটি হয়ে উঠেছে স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত এক আকর্ষণ।
প্রকৃতির দুটি গাছকে ঘিরে মানুষের এমন আবেগ, আচার ও বিশ্বাস সহজেই কৌতূহল জাগায়। কারও কাছে এটি ধর্মীয় অনুভূতির প্রকাশ, কারও কাছে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির ব্যতিক্রমী নিদর্শন। তবে রাজেন্দ্রনাথ ও করিবালা সরকারের পরিবারের কাছে বটেশ্বরী আজও মেয়ের মতোই আপন, আর পাকুড়গাছ তাদের সেই মেয়ের জীবনসঙ্গী।
সময়ের স্রোতে বদলে গেছে অনেক কিছু, কিন্তু খিদির বটতালায় বটেশ্বরী ও পাকুড়গাছকে ঘিরে চলে আসা এই প্রথা এখনো টিকে আছে। ১৬ বছরের এই গল্পে মিশে আছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, গ্রামবাসীর সম্মিলিত উদ্যোগ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা লোকবিশ্বাস।


