ভোরের আকাশে তখনও মিশে আছে রাতের শেষ নীলচে ছায়া। দিগন্ত জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সূর্যের প্রথম আলো। আর সেই আলোয় দূরের আকাশে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বরফে মোড়ানো এক অপরূপ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। কখনও লালচে, কখনও গোলাপি, আবার কখনও শুভ্র সাদা রঙে সেজে ওঠা হিমালয়ের এই রূপ যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত ছবি।
পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে হিমালয়ের এই সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ মিলছে। আর কাঞ্চনজঙ্ঘার মায়াবী সৌন্দর্য ও দৃশ্য দেখতে ভোর হলেই ভিড় করছে প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকরা। এই আকর্ষণই যেন মানুষকে দেশের সর্ব উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া বারবার টেনে আনে।

এদিকে কয়েকদিন অপেক্ষার পর টানা তিনদিন ধরে কাঞ্চনজঙ্ঘার মায়াবী সৌন্দর্য দেখা যাচ্ছে। চিরাচরিত অপেক্ষা শেষে কাঞ্চনজঙ্ঘা দুচোখ ভরে দেখতে পেয়ে উচ্ছ্বসিত দর্শনার্থীরা। কেউ মুঠোফোনে, কেউবা ক্যামেরায় ধরে রাখছেন চোখ জুড়ানো সেই মুহূর্ত। প্রিয়জনদের সঙ্গে ছবি তুলে স্মৃতির পাতায় জমা করছেন প্রকৃতির এই অপার বিস্ময়৷
মেঘ কিছুটা পরিস্কার থাকায় গত কয়েকদিন ধরে সীমান্তবর্তী এই উপজেলায় দেখা মিলছে হিমালয়ের এই পর্বত শৃঙ্গের। আকাশ মেঘমুক্ত থাকায় দূর দিগন্তে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বরফ ঢাকা পর্বত চূড়া। সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় তার রং। প্রকৃতির এই রঙের খেলা মুগ্ধ করেছে আগত পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের। তবে মেঘ ও আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে প্রতিদিন সমানভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলেনা।
এ সময়ে শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘাই নয়, দেখা যাচ্ছে ভারতের বিভিন্ন পাহাড়ের দৃশ্যও। পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা লাইটগুলোও জ্বলজ্বল করছে৷ ফলে ঘুরতে আসা পর্যটকরা তিন দেশের সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারছেন। বাংলাদেশের চা ও নদী, ভারতের পাহাড় ও দূরের ভারত-নেপাল সীমান্তের কাঞ্চনজঙ্ঘা৷

এদিকে সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর হলেই পর্যটকদের ভিড় জমে তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো মহানন্দার তীরে। সেখান থেকে ভোর থেকে শুরু করে দিনভর কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করেন দর্শনার্থীরা।
পর্যটকরা বলছেন, হিমালয় পর্বতমালার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। দূর থেকে দেখা গেলেও এর বিশালতা আর সৌন্দর্য পর্যটকদের মনে তৈরি করেছে অন্যরকম এক অনুভূতি। অনেকের কাছে এটি কেবল একটি পর্বত শৃঙ্গ নয়, বরং ব্যস্ত জীবনের বাইরে প্রকৃতির সান্নিধ্য কিছুটা সময় কাটানোর এক অন্যন্য উপলক্ষ।
জানা যায়, শুধু পঞ্চগড় নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে তেঁতুলিয়া ছুটে আসছেন পর্যটকরা। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার পাশাপাশি ঘুরে বেড়াচ্ছেন আশপাশে দর্শনীয় স্থানগুলোতেও। বিশেষ করে সমতলের চা বাগান, তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো ও পিকনিক কর্নার, বহমান মহানন্দা নদীর তীর, বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, আনন্দধারসহ জেলার বিভিন্ন পর্যটন এলাকাগুলো। তবে বিশেষ করে মহানন্দা নদীর তীর ও তেঁতুলিয়ার ডাকবাংলা এলাকায় বাড়ছে দর্শনার্থীর আনাগোনা। পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে এসব এলাকা।
এদিকে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে ঘিরে পর্যটকদের আগমনে স্থানীয় পর্যটন খাতে ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। এরই মধ্যে আগামী ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত উপজেলা সরকারি বেসরকারি আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে বুকিং হয়ে গেছে। পর্যটকদের এই বাড়তি আগ্রহ স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। পর্যটকদের আগমনে স্থানীয় অনেক মানুষ তাদের বাড়ির ঘরগুলোও সাজিয়ে তুলেছেন। পর্যটকদের সুবিধার্থে তাদের রুমগুলো ভাড়া দিচ্ছেন। এতে তারা যেমন আয় করছেন অন্যদিকে উপকৃত হচ্ছেন পর্যটকরাও৷

তবে এখানে আগত পর্যটক এবং স্থানীয়রা মনে করেন, সম্ভাবনার এই পর্যটন খাতকে আরও এগিয়ে নিতে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ। পর্যটকদের জন্য উন্নত সুযোগ-সুবিধা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পরিছন্ন পরিবেশ ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের দাবি জানিয়েছে পর্যটকরা।
ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা আশিক ইকবাল নামে এক কলেজ ছাত্র বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে তেঁতুলিয়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে এসেছি। কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরুপ দৃশ্য আমাদের মুগ্ধ করেছে।’
একই কথা বলেন সাবিহা জান্নাত তুবা নামে আরেক তরুণী। তিনি বলেন, ‘দুই চোখে তিন দেশের সৌন্দর্য অবলোকন করেছি। কাঞ্চনজঙ্ঘা ভোর থেকে দেখেছি। আমার পরিবারসহ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে অভিভূত।
এদিকে তেঁতুলিয়ায় ঘুরতে আসা নাজিম উদ্দীন নামে আরেক পর্যটক বলেন, সীমান্তের ওইপাড়ের সৌন্দর্য অসাধারণ। কিন্তু, এপারের তেঁতুলিয়া পিকনিক কর্ণার ও পর্যটন বিকাশ আরও সুন্দর করা প্রয়োজন। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে না পারলেও তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন স্থান ঘুরেও সময় কাটানো সম্ভব।
ভ্যানচালক আব্দুল বাসেদ বলেন, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা যখন দেখা যায় তখন পর্যটকদের ঢল নামে তেঁতুলিয়ায়। আর তাদের ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়িয়ে যা ভাড়া পাই সেই আয় দিয়ে আমরা চলি। এ সময় ভালোই আয় হয়। বছরের অন্য সময় আর তেমন হয় না।’

তেঁতুলিয়ার ব্যক্তি উদ্যােগে গড়ে ওঠা তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো মেঘালয় রিসোর্টের চেয়ারম্যান আব্দুল মোতালেব বলেন, ‘অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এই সময়টাতে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাওয়ায় পর্যটকদের অনেক ভিড় হয়। আমাদের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সব রুম বুকিং হয়ে গেছে।’
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় বলেন, কাঞ্চনজঙ্ঘার দর্শন মূলত আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে। মেঘ মুক্ত আকাশ থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে আসার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে ভ্রমণের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি৷
এ বিষয়ে তেঁতুলিয়া ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের সভাপতি এস কে দোয়েল বলেন, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে আসা পর্যটকদের ভিড় জমছে তেঁতুলিয়ায়। আমরা তেঁতুলিয়াকে পর্যটন নগর হিসেবে ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি তেঁতুলিয়া পর্যটন খাত উন্নয়নে ব্যক্তি উদ্যােগের পাশাপাশি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসাইন বলেন, নিরাপত্তা যাতায়াত ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি টুরিস্ট পুলিশ ও প্রশাসন কাজ করছে পর্রযটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে। পর্যটন বিকাশে আরও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।


