ঢাকায় নগর পরিবহনে যে বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম আর যাত্রীদের অসন্তুষ্টির পাহাড়, তা থেকে কোনো অংশেই ভিন্ন নয় সরকারি পরিবহন সংস্থা- বিআরটিসির বাসও। যে বাসগুলো যাত্রী পরিবহনে অন্যদের উদাহরণ হওয়ার কথা ছিল, সেই বাসগুলোতেও একই ধরনের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলায় হতাশ যাত্রীরা।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যেখানে সেখানে যাত্রী তোলা-নামানো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই বাস স্টপে অপেক্ষা করা বিআরটিসি বাসগুলোর এক নিয়মিত চিত্র।
এমনই এক ঘটনা ধরা পড়ে টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধানে।
ঢাকার শাহবাগ মোড়ে দুপুরের ব্যস্ত সময়। মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে কয়েক মিনিটের জন্য থমকে যায় পুরো সড়ক। বিআরটিসির দুটি ডাবল ডেকার বাস সড়কের মাঝখানে থামিয়েই চলে যাত্রী ওঠা-নামা। অথচ কয়েকগজ দূরেই নির্ধারিত বাসস্টপ, তবুও নিয়ম মেনে সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি চালক। যাত্রীরাও হুড়োহুড়ি করে উঠছেন-নামছেন, দুই বাসের পেছনে জমছে গাড়ির দীর্ঘ সারি।
আশপাশে থাকা ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা বাঁশি বাজিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন, কিন্তু বিআরটিসি বাসের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। কিছুক্ষণ পর হাতের ইশারায় বাসটিকে কেবল কিছুটা সামনে এগিয়ে যেতে বলা হয়।
রাজধানীর শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট, মহাখালী, সায়েন্সল্যাব কিংবা মতিঝিল- প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ মোড়েই এখন একই দৃশ্য।
রাজধানীতে গণপরিবহনে যে নৈরাজ্য আর আইন না মানার প্রবণতা, তার মধ্যে সরকারি বাস হিসেবে বিআরটিসি কোনো উদাহরণ তৈরি করতে পারছে না।
বেসরকারি বাসের মতো এগুলোও নির্ধারিত বাস বে উপেক্ষা করে, কখনও একাধিক লেন আটকে থেমে থাকে এবং নিয়মিত সড়কের মাঝখান থেকে যাত্রী ওঠানামা করায়। ফলে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট।
কাজেই যে প্রতিষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল শৃঙ্খলাপূর্ণ গণপরিবহনের মডেল, সেটিই আজ অনেকের কাছে নগর বিশৃঙ্খলার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা যখন প্রকাশ্যে নিয়ম ভাঙে, তখন সেটি পুরো সড়ক সংস্কৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ বেসরকারি পরিবহনগুলোও তখন ধরে নেয়, যাত্রী ধরতে নিয়ম ভাঙাই স্বাভাবিক। ফলে রাজধানীর সড়কে প্রতিযোগিতা শুরু হয় কে কত দ্রুত যাত্রী তুলতে পারে- শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা তখন আর অগ্রাধিকার থাকে না।’
বিষয়টি কেবল যাত্রী উঠানামার নয়, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে সারাদেশে যে বিস্তর অভিযোগ, তা থেকে বাইরে নয় সরকারি কোম্পানি নিজেও। স্টপেজ থেকে দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়ার বদলে খেয়ালখুশি মতো আদায়ের বিষয়টি যাত্রীরা হতাশ হয়ে মেনেও নিয়েছে।
কয়েকটি বাসের চালক ও হেল্পাররা জানালেন, বিআরটিসি এখন আর নিজেরা বাস পরিচালনা করে না, ইজারা দিয়ে দেয়। অবশ্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চালক থাকে নিজেদের। ইজারাদার কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোম্পানি বলে তারা বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন।
অথচ একই কাজ কোনো বেসরকারি বাস করলে তাৎক্ষণিক মামলা বা জরিমানা হয়, কিন্তু বিআরটিসির ক্ষেত্রে অনেক সময় দায়সারা সতর্কবার্তাতেই শেষ হয়ে যায়। ফলে ধীরে ধীরে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে, সরকারি পরিবহন ট্রাফিক আইন থেকে কার্যত অলিখিত ছাড় পেয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে বিআরটিসির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ, ফিটনেসবিহীন চলাচল এবং জরিমানা এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ সত্য নয়’ বলে দাবি করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-ওয়ারী বিভাগ) মোহাম্মদ আবু তাহের।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আমরা কোনো ধরনের ছাড় দিচ্ছি না। সরকারি গাড়িতেও ভিডিও মামলা করা হচ্ছে। বিআরটিসি বাসের কাগজপত্র না থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
তবে একইসঙ্গে তিনি অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘ঢাকায় কিছু বাস ফিটনেসবিহীন অবস্থায় চলাচল করে। আমরা বিআরটিসির সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা করছি এবং নিয়মিত মামলা করছি। হয়তো কিছু ক্ষেত্রে বিআরটিসিরটা একটু কম চোখে পড়ে।’
নিয়মিত বিআরটিসিতে যাতায়াতকারী নাজমা বেগম বলেন, ‘১০ মিনিট পর পর বাস ছাড়ার কথা, সেখানে ৪০-৫০ মিনিট দেরি করে। বাসের কোনো ভালো ফ্যান নাই, এসি চলে না। যেখানে সেখানে উঠায়-নামায়। কোনো শৃঙ্খলা নাই। এই অবস্থা কোনো মেগাসিটির সঙ্গে যায় না।’
আরেক যাত্রী মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সরকারি পরিবহন হওয়ায় মানুষের প্রত্যাশা বেশি থাকে, কিন্তু বাস্তবে সেবার মান অত্যন্ত নিম্নমানের। ডিজাইন, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সব জায়গাতেই অবহেলা।’
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘কোনো দেশে রাষ্ট্রীয় পরিবহন প্রতিষ্ঠানের পরিষেবার মডেল এমন নয়।’
‘কেমন হওয়া উচিত ছিল?’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিআরটিসির জন্মই হয়েছে গণপরিবহন খাতে সেবা দেওয়ার জন্য। এটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান বানানোর প্রতিযোগিতায় নামার কথা ছিল না।’
‘রাষ্ট্রীয় পরিবহন হিসেবে বিআরটিসির উচিত ছিল সুষ্ঠু রুট পরিকল্পনা, নির্ধারিত বাস বে ব্যবহার, সময়ানুবর্তিতা এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ সেবা নিশ্চিত করা। পৃথিবীর আধুনিক কোনো রাষ্ট্রে সরকারি পরিবহনের মডেল এমন নয়, যেখানে সাধারণ মানুষের জন্য কেনা বাস নিয়ম ভেঙে উল্টো বিশৃঙ্খলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিআরটিসি বরং বেসরকারি বাসগুলোর জন্য একটি রোল মডেল হতে পারত’, যোগ করেন তিনি।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘একটি মেগাসিটির ট্রাফিক ব্যবস্থা কার্যকর করতে বিআরটিসির মতো রাষ্ট্রীয় গণপরিবহনের সুষম ট্রিপ শেয়ার, উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। কিন্তু বাস্তবে বিআরটিসি এখন সেই ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ। বরং সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়ানোর অভিযোগই বেশি শোনা যায়।’
বিআরটিসিকে কোন ভূমিকায় দেখতে চান এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ শামসুল হক টাইমসকে বলেন, ‘একটি মেগাসিটির পরিবহন ব্যবস্থায় বিআরটিসির মতো রাষ্ট্রীয় গণপরিবহন সংস্থার ভূমিকা হওয়া উচিত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা।’
পাশাপাশি গণপরিবহন একটি উচ্চমাত্রার কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক খাত, তাই এখানে দক্ষ নেতৃত্ব, বৈজ্ঞানিক রুট পরিকল্পনা এবং কঠোর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।


