বর্ষা এলে রাজধানীর উপকণ্ঠ মাতুয়াইলের আকাশে শুধু মেঘ জমে না, জমে আতঙ্কও। শহীদনগর, শামীমবাগ, আদর্শবাগ, মুন্সীবাগ, তুষারধারা কিংবা কুতুবখালী-এই জনপদগুলোর মানুষের কাছে বৃষ্টি এখন আর ঋতুর সৌন্দর্যের নাম নয়; বরং জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগ আর অনিশ্চয়তার প্রতিশব্দ।
একটু বৃষ্টি হলেই কোথাও খাল উপচে রাস্তা তলিয়ে যায়, কোথাও ড্রেনের কালচে নোংরা পানি ঢুকে পড়ে ঘরে। কোথাও আবার হাঁটুসমান পানির ভেতর দিয়েই শিশুদের স্কুলে যেতে হয়।
বছরের পর বছর ধরে চলা এই দুর্ভোগ এখন এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছেছে, যেখানে স্থানীয়দের ভাষায় ‘জলাবদ্ধতা’ আর সাময়িক সংকট নয়, বরং স্থায়ী অভিশাপ।
রোদ বা বৃষ্টি, বছরের বেশিরভাগ সময়ই মাতুয়াইল হাসপাতাল রোড, শহিদবাগ, মুন্সীবাগ, শামীমবাগ, রায়েরবাগ, তুষারধারা, সাদ্দাম মার্কেট ও কুতুবখালী এলাকার বহু সড়ক নর্দমার ময়লা পানিতে ডুবে থাকে। খানাখন্দে ভরা ভাঙাচোরা রাস্তা আর দুর্গন্ধযুক্ত স্থির পানির মধ্যে দিয়েই প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে চলাচল করতে হয়। কোথাও বোঝার উপায় থাকে না কোনটা রাস্তা, আর কোনটা খাল।
হতাশা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মো. আবদুর করিম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বৃষ্টি শুরু হলেই মনে হয় আমরা শহরে না, ডোবার মধ্যে বাস করি। বাচ্চাকে স্কুলে নিতে হলে কোলে করে পানি পার হতে হয়। রাতে বিদ্যুৎ থাকলেও ভয় লাগে। রাস্তার গর্ত দেখা যায় না, কখন কে পড়ে যায়।’
শহীদনগরের বাসিন্দা রুবিনা আক্তার বলেন, ‘আমার শাশুড়িকে একদিন হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। অ্যাম্বুলেন্স গলিতে ঢুকতে পারেনি। হাঁটু পানি ঠেলে স্ট্রেচার নিয়ে যেতে হয়েছে। এটা কোনো শহরের চিত্র হতে পারে?’
এলাকার কোথাও ড্রেন উপচে কালো পানি বাসার ভেতরে ঢুকছে, কোথাও ময়লার স্তূপ আটকে দিচ্ছে পানির প্রবাহ। রাস্তায় জমে থাকা নোংরা পানির মধ্যে পড়ে থাকছে প্লাস্টিক, পলিথিন, পচা আবর্জনা। সেই পানিতেই খেলছে শিশু, হেঁটে যাচ্ছেন বৃদ্ধ, চলাচল করছেন কর্মজীবী মানুষ।
এর প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্যের ওপরও। নোংরা পানিতে চলাচলের কারণে চর্মরোগ, ডায়রিয়া ও ভাইরাল জ্বর বাড়ছেই। পানিতে জন্ম নিচ্ছে মশা, বাড়ছে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও। অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল দখল এবং দুর্বল ড্রেনেজব্যবস্থার কারণে এই পরিস্থিতি দৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সমস্যার মূল কারণ দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং অবহেলা।
মাতুয়াইলের এই অংশ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) মধ্যবর্তী সীমানায় পড়েছে। স্থানীয়দের মতে, এই ‘সীমানা জটিলতা’ই তাদের দুর্ভোগকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করেছে। এক সংস্থা আরেক সংস্থার ওপর দায় চাপালেও বাস্তবে বছরের পর বছর জলাবদ্ধতার মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
মো. জসিম উদ্দিন নামে একজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ট্যাক্স আমরা নিয়মিত দিই। কিন্তু কাজের সময় সবাই বলে এটা তাদের এলাকার মধ্যে পড়ে না। তাহলে আমরা যাব কোথায়?’
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে কুতুবখালী খাল। যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী ও দুনিয়া এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়া খালটি এখন কার্যত ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
খালের পানিতে ভাসছে কাঁথা, বালিশ, প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট থেকে শুরু করে গৃহস্থালির নানা বর্জ্য। কোথাও কোথাও ময়লার স্তূপ এতটাই জমে গেছে যে পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে।
আশপাশের দোকানপাট ও বাসাবাড়ি থেকে বছরের পর বছর ধরে সরাসরি খালে ময়লা ফেলা হচ্ছে। এমনকি রাতের আঁধারে ময়লার গাড়িও এসে এখানে বর্জ্য ফেলে যায়।
কুতুবখালীর বাসিন্দা শরীফউদ্দিন বলেন, ‘একটু বৃষ্টি হলেই বাড়িঘর পানিতে ভরে যায়। এই খাল এখন খাল না, ময়লার স্তূপ। আমরা খুব কষ্টে আছি।’
রাস্তার পাশের দোকানদার মো. সেলিমের ভাষায়, ‘বৃষ্টি হলেই রাস্তা আর খালের পার্থক্য বোঝা যায় না। হাঁটু পানি ঠেলে ব্যবসা করতে হয়।’
সম্প্রতি মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিতে কুতুবখালী খাল উপচে পড়ে আশপাশের রাস্তা, বাজার ও বাসাবাড়িতে নোংরা পানি ঢুকে পড়ে। একটি মুদিখানার দোকানের সামনে গ্যাসের সিলিন্ডার পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকতে দেখা যায়।
ব্যবসায়ীরা পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাইকচালকরা ইঞ্জিনে পানি ঢোকার ভয়ে মাঝরাস্তায় থেমে যান। বহু নারীকে শিশুকে কোলে নিয়ে হাঁটুসমান পানি পার হতে দেখা গেছে।
এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘প্রতি বছর একই অবস্থা। সবাই আসে, ছবি তোলে, আশ্বাস দেয়। কিন্তু বৃষ্টি নামলেই আমরা আবার পানির নিচে।’
জলাবদ্ধতা নিরসন, ভাঙাচোরা সড়ক সংস্কার এবং নাজুক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে গত ১০ যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল হাসপাতালের সামনে সড়ক অবরোধ করে এলাকাবাসী।
‘জনদুর্ভোগ আর নয়, নাগরিক সেবা নিশ্চিত হোক’এই স্লোগানে আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নেন মাতুয়াইল, শহিদবাগ, মুন্সীবাগ ও শামীমবাগ এলাকার বাসিন্দা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা।
তারা ডিএনডি এলাকার খাল ও নালা পরিষ্কার করার দাবি জানান। তাদের মতে, খালগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং ড্রেন থেকে আবর্জনা অপসারণ ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সিটি করপোরেশন বলছে, শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; নাগরিক অসচেতনতাও বড় কারণ।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান তালুকদার টাইমসকে বলেন, ‘জরিমানাই সমাধান নয়। জনগণের সম্পৃক্ততা থাকলে জরিমানা করতে হয় না। সবাইকে অনুরোধ করতে হবে যেন কেউ খালে ময়লা না ফেলে।”
সিটি করপোরেশনের কর্মীরা বলছেন, খাল ও নালা পরিষ্কার করা হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই আবার সেখানে ময়লা জমে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুতুবখালী খালের দুই পাড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য দোকান ও অস্থায়ী স্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসা রোড এলাকার অস্থায়ী দোকানগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সরাসরি খালে ফেলা হয়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুল সালাম সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধে এখন থেকে দোষীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা আবর্জনা রাস্তায় ফেলবে, তাদের বাড়ির হোল্ডিং নম্বর শনাক্ত করে মোবাইল কোর্ট পাঠানো হবে।’
নগর পরিকল্পনাবিদআদিল মুহাম্মদ খানটাইমসকে বলেন, ‘শুধু বর্ষাকালে পরিষ্কার অভিযান চালিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নাগরিক সচেতনতা নিশ্চিত করা।’


