প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও সাংবাদিক সঞ্জীব চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকী বুধবার (১৯ নভেম্বর)। তিনি ২০০৭ সালের আজকের দিনে চলে যান না ফেরার দেশে। অসাধারণ এ শিল্পীদের মৃত্যুতে তাকে স্মরণ করেছেন দেশের সংগীতাঙ্গনের বরণ্য শিল্পী, গীতিকার ও সুরকাররা।

ধ্রুব এষ
চিত্রশিল্পী ও লেখক
টুপুর মামা ঢাকায় আসে।
পিককে বসে মদ খেয়ে যায়।
সঞ্জীবদার সঙ্গে।
যাবার সময় সতর্কবাণী দিয়ে যায়, ‘ভাগ্নারে ইতা কইওনা, কাকা।’
নূপুর মামা ঢাকায় আসে।
পিককে বসে মদ খেয়ে যায়।
সঞ্জীবদার সঙ্গে।
যাবার সময় সতর্কবাণী দিয়ে যায়, ‘ভাগ্নারে ইতা কইওনা, কাকা।’
আমি ঢাকায় থাকি।
আমরা পিককে মদ খেতে যাই।
কখনও কখনও সঞ্জীবদার সঙ্গে।
সঞ্জীবদা কুটকুট করে হাসে।—শোন কাইল তো টুপুর আইছিল্। বা, শোন কাইল তো নূপুর আইছিল্। কইসে তোরে ইতা কিছু না কইতে। এ! তোর পেগ দেখি শেষ অইছেনা বে! শেষ কর! আরেকটা নে!
আমার টুপুর মামা ও নূপুর মামার কাকা সঞ্জীবদা। আমার তবে কী? দাদামশাই হয় সম্পর্কে। দাদু।
দৈনিক ‘ভোরের কাগজ’-এর ‘মেলা’ পাতা করত সঞ্জীবদা। কিছুদিন তার সঙ্গে অফিসিয়ালি কাজ করেছিলাম। জলের মানুষ আপাদমস্তক। জল ডাকে আয় সারাদিন। ‘কর্মব্যাস্ত দিনের ফাঁকে, ক্লান্ত অবসরে’, কী একটা বিজ্ঞাপনের ট্যাগ লাইন ছিল, সেই রকম—কর্মব্যস্ত দিনের ফাঁকে, দুপুর হলে পরেই, ‘চল! চল! চল!’
কোথায় চলব?
কেন ‘শ্যালে’ কি উঠে গেছে নাকি?
সঞ্জীবদার সঙ্গে প্রথম টাকিলা শ্যালেতে। কীভাবে খেতে হয় নাতিকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়েছিল দাদু। টাকিলার মাহাত্ম্য প্রথম বুঝতে পারি নাই, আট শট মেরে দিয়েছিলাম। ছ্যারাবেরা অবস্থা হয়েছিল। সঞ্জীবদা তের শট প্লাস হুইস্কি রানিং। নাথিং সিরিয়াস।
সঞ্জীবদা দাদু, সেই সম্পর্কে আমার নানী হলো শিল্পী। তারা তখন মোহাম্মদপুরের কাটাসুরে থাকে। সঞ্জীবদা একদিন ধরে নিয়ে গেল। নানী রাগ করে গোস্বাঘর করেছে। মধ্যস্থতার চেষ্টা করলাম এবং অবশ্যই সফল হলাম না। নানী তার ঘরে গোস্বা করে থাকল। পাশের ঘরে অতন্দ্র ও দুঃখী সঞ্জীবদা আর আমি। রাতভর সঞ্জীবদার দুঃখের কথা শুনলাম। দুঃখ হলো না। ভোর হয়ে গেল, এক ফোটা ঘুমাই নাই, বললাম, ‘আইচ্ছা ঠিক আছে অখন আফনে ঘুমাই যাইন গিয়া।’
আরও দুঃখিত হয়ে কাতর সঞ্জীবদা বলল, ‘ঘুমাইতে গেলে তাই আমারে লাত্থি দিয়া ফালাই দিব তুই জানস?’
মোটেও তা না। আমার নানী খুবই ভালো লোক।
ভালো লোক ছিল আমার দাদুও। সঞ্জীবদা। সঞ্জীব চৌধুরী। তার চরম সৃজনশীল সময়ে আমি তাকে কিছুদিন দেখেছি। ‘দলছুট’ সেই সময়ের ব্যাপার। কিসব গান করে রেখে গেছে!
আমি তোমাকেই বলে দেব
তুমি আমার বায়ান্ন তাস
কল্পনা চাকমার গান
তোমার বাড়ির রঙের মেলায়…
চিরকালের গান হয়ে গেছে এইসব। আর চিরকালের ছিল, আছে, থাকবে আমার দাদু সঞ্জীব চৌধুরী। সবার সঞ্জীবদা।
মানুষ অসংখ্য পকেটে বাঁচে। একটু একটু করে একেকটা পকেটে। এককণা হয়ে কোনো পকেটে, আধকণা হয়ে কোনো পকেটে। আমি ক্ষণজন্মা সঞ্জীব চৌধুরীর আধকণার একটা পকেট ছিলাম হয়তো। তাই কত!

তার প্রতিবাদী ও কাব্যিক লেখনী আজকের শিল্পীদের জন্য উদাহরণ
সৈয়দ হাসান টিপু
সংগীতশিল্পী
সঞ্জীব চৌধুরী রেখে গেছেন অসাধারণ সব গান আর লেখা। তার লিরিকগুলো সুরারোপ হয়ে গানে রূপ নেওয়ার পর আমরা পেয়েছি কিছু অনন্য, সময়কে অতিক্রম করা সৃষ্টি—যেগুলো কোনোদিনই ভুলে যাওয়ার নয়। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো এমন আরও অনেক গান আমরা পেতাম।
সঞ্জীব চৌধুরী মূলত ছিলেন একজন সাংবাদিক। আমার বিশ্বাস, তিনি আজ বেঁচে থাকলে নিজের লেখনীর মাধ্যমে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতেন। এখন যে অস্থিরতা আর ভারসাম্যহীনতার মধ্যে আমরা এগোচ্ছি, সে বিষয়ে তার লেখায় নিশ্চয়ই প্রতিবাদ থাকত, আর যেসব ভালো পরিবর্তন ঘটছে, সেগুলোর পক্ষে দৃঢ় বক্তব্যও থাকত।
সঞ্জীব দার অন্যতম বড় গুণ ছিল অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করতেন একজন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে, আর রাজনৈতিক সচেতনতা তার ভিতরে গভীরভাবে ছিল। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার বড় ভূমিকা ছিল। তার লেখায় এসব বিষয় অত্যন্ত ধারালোভাবে উঠে আসত—এবং তিনি নিয়মিতই তা করতেন।
তার প্রতিবাদী ও কাব্যিক লেখনী আজকের তুলনামূলকভাবে কম রাজনৈতিক সচেতন শিল্পীদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তার গান আর লেখায় যে রাজনৈতিক সচেতনতা দেখা যায়, সেটাই প্রমাণ করে—দেশের প্রতি তার ভালোবাসা কত গভীর ছিল।
আমাদের দেশের একটি বড় সমস্যাই হলো—মানুষেকে আমরা মূল্য দিই মূলত তার মৃত্যুর পর। অথচ তা হওয়া উচিত জীবিত থাকতেই।
সঞ্জীব দার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি খুব বেশি নয়। বাপ্পা মজুমদারের স্টুডিও আমার বাসার ঠিক সামনে ছিল। রাতে তিনি বাসায় ফিরতেন, আর তখন স্টুডিওর সামনে সঞ্জীব দার সঙ্গে দেখা হতো। সেই সময়ই আড্ডা জমে উঠত।
আমাদের সম্পর্কের বিশেষত্ব ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা। দুজনের মধ্যে সেই শ্রদ্ধার জায়গাটা সবসময়ই সমান ছিল।
সঞ্জীব চৌধুরীর চলে যাওয়া আজও মেনে নেওয়া কঠিন। মানুষ হিসেবে তাকে এখনও খুব মিস করি।

‘সঞ্জীব চৌধুরী একটা দর্শনের নাম’
জয় শাহরিয়ার
সংগীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার
সঞ্জীবদা আসলে আমার কাছে একটা দর্শনের নাম। গায়ক, গীতিকার, সুরকার, সাংবাদিক—এগুলো তার অনেকগুলো পরিচয়। তিনি আর দশজন সাংবাদিক-গীতিকার-সুরকারের চেয়ে আলাদা তার দর্শনের কারণে। একটা প্রজন্মের ওপর তিনি তার গান, কবিতা, লেখায় প্রভাব রেখে গেছেন। তার সে দর্শনের প্রভাব ছড়িয়ে যাচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মধ্যে। এটাই সঞ্জীবদার সবচেয়ে বড় প্রভাব আমাদের সংগীতে, সংস্কৃতিতে ও যাপনে। আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই ভাগ্যবান যে দাদার সান্নিধ্য পেয়েছি, তার আদর পেয়েছি। তার গান, যাপন আমার পছন্দ। সে সবকিছু সাথে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের মতন যারা দাদার গান, যাপন পছন্দ করেন তাদের জীবনে, যাপনে, দর্শনে একজন সঞ্জীব চৌধুরী বেঁচে থাকবেন।

তরুণদের কণ্ঠের মাধ্যমে আজও বেঁচে আছেন
টোকন ঠাকুর
লেখক, গীতিকার, চলচ্চিত্র পরিচালক
বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালীন আমাদের সিনিয়র হিসেবে পেয়েছিলাম সঞ্জীব চৌধুরীকে। তিনি ছিলেন একাধারে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির কর্মী, গায়ক, কবি, গল্পকার ও সাংবাদিক। একই সঙ্গে, তিনি এই শহরে এক প্রাণখোলা শিশুর মতো মন নিয়ে একজন শিল্পী হিসেবে বিরাজ করতেন।
সঞ্জীবদার নেতৃত্বেই আমাদের মধ্যেই গানের দল ‘দলছুট’ গড়ে ওঠে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাপ্পা মজুমদার ও আরও অনেকে। এর আগে ‘মন্দিরা’ নামে তার হয়তোবা প্রথম একটি ব্যান্ড ছিল। আমি তখন চারুকলায় পড়তাম এবং তিনিও চারুকলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নব্বইয়ের দশকেই নতুন ধরনের গান, নতুন কথা ও সুর নিয়ে ‘দলছুট’-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে।
সঞ্জীবদার প্রথম একক অ্যালবাম, ‘স্বপ্নবাজি’, ছিল একটি বিশেষ প্রয়াস। সেখানে বারোজন মানুষ বারোটি লিরিক লিখেছিলেন, যার মধ্যে আমার লেখা একটি গানও ছিল।
নাটক, সিনেমা, গান, কবিতা—শিল্পের নানা ক্ষেত্রেই সঞ্জীবদার অবাধ বিচরণ ছিল। তিনি ছিলেন একজন সার্থক শিল্পী, যার গান অনেকের, বিশেষত আমার, ভীষণ প্রিয়। একজন ভালো সাংবাদিক হিসেবেও আমরা তার সঙ্গে কাজ করেছি।
সঞ্জীবদা ছিলেন একজন প্রেমিক পুরুষ, এটি তার একটি বিশেষ গুণ। তার আরেকটি দিক হলো, তিনি মদ্যপানে স্বচ্ছন্দ ছিলেন এবং সম্ভবত এটিকে তিনি তার ভালো থাকার অন্যতম মাধ্যম মনে করতেন। আমরা দেখেছি যে, কখনো কখনো এর মাত্রাতিরিক্ততা বিপত্তিরও জন্ম দিত।
দুর্ভাগ্যবশত, ২০০৭ সালে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে আমরা তাকে হারাই। সুন্দরবন উপকূলীয় বাগেরহাট থেকে ফেরার পথে সেই রাতেই অধিক অ্যালকোহলের কারণে তার ব্রেন স্ট্রোক হয়। দু-তিন দিন লড়াই করার পর তিনি চলে যান।
সঞ্জীবদা চলে যাওয়ার অর্থ হলো—আমরা, আমাদের সময়ের একজন প্রাণখোলা, প্রতিবাদী ও একই সঙ্গে প্রেমিক সত্তার ধারক শিল্পীকে হারালাম। বাংলা গানের শ্রোতারা তাদের পছন্দের শিল্পীকে হারালেন। বাংলা গানের ইন্ডাস্ট্রি হারাল একজন প্রতিভাবান মানুষকে।
আমাদের বাংলা গানে প্রেম ও ভাবালুতার শিল্পীর সংখ্যা বেশি। সঞ্জীব চৌধুরী এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি যেমন ছিলেন প্রতিবাদী, জনমানুষের অধিকারের প্রশ্নে তিনি রীতিমতো অ্যাক্টিভিস্টের ভূমিকা পালন করতেন, আর সেই সক্রিয়তা প্রকাশ পেত গান ও কবিতার মধ্য দিয়ে। তার লেখা সেসব কবিতা নিয়ে বইও প্রকাশিত হয়েছে।
সঞ্জীবদার অসংখ্য গান আজও ক্যাম্পাসের যুবকেরা রাতের বেলা মাথায় নিয়ে ফেরে, কণ্ঠে নিয়ে ফেরে। তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘আমি তোমাকেই বলে দেবো’ যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রাত জেগে বা দল বেঁধে গাওয়া হয়, তখন অনুভব করা যায়—সঞ্জীবদা সেই তরুণদের কণ্ঠের মাধ্যমে আজও বেঁচে আছেন। যারা গান শুনছেন, তাদের মধ্যেও তার অস্তিত্ব বিদ্যমান।

এই সময়ে সঞ্জীবদার মতো একজন মানুষের উপস্থিতি খুব বেশি দরকার ছিল
বাপ্পা মজুমদার
সংগীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার
প্রয়াণ দিবসে সঞ্জীবদাকে নিয়ে আসলে কী বলবো! শব্দ খুঁজে পাই না। আমার সংগীতজীবনে পরিবারের বাইরে তিনি ছিলেন আমার মেন্টরদের একজন। আরেকজন হচ্ছে জুয়েল ভাই।
সঞ্জীবদা মানুষ হিসেবে ছিলেন একজন অসাধারণ মানুষ, একজন অসাধারণ বন্ধু, বড় ভাই এবং দিকনির্দেশক। তার সঙ্গে কথা বলার মাধ্যমে আমি অনেক সময় পথ খুঁজে পেতাম এবং দিশা লাভ করতাম। আমার যেকোনো প্রশ্ন বা দ্বিধা নিয়ে তিনি খুব কার্যকর দিকনির্দেশনা দিতেন। মানবিকতা ও বোধের জায়গা থেকে তিনি ভীষণ রকম সহযোগিতা করতেন। আসলে, সামগ্রিকভাবে মানুষ হিসেবে তাকে কয়েক শব্দে ব্যাখ্যা করা সত্যিই কঠিন। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ মানের লেখক, কবি, গায়ক এবং সাংবাদিক।
তার জ্ঞানের পরিধি ছিল বিশাল। যেকোনো বিষয় সম্পর্কে তার খুব স্পষ্ট ধারণা ছিল—সেটা গণিত হোক বা জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা হোক। তিনি খুব সহজে এবং সাবলীলভাবে সেই কঠিন বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করতেন।
আমার এখনো মনে হয়, মঞ্চে গান গাওয়ার সময় যেন সঞ্জীবদা আমার পাশেই আছেন। আর, দলছুটের যাত্রায় সঞ্জীবদার অসাধারণ লেখনী ও কাজ ব্যান্ডটিকে এক বিশাল উচ্চতায় নিয়ে এসেছে।
আমরা সবাই তাকে খুব মিস করি। আমার কেন জানি মনে হয়, এই সময়ে সঞ্জীবদার মতো একজন মানুষের উপস্থিতি খুব বেশি দরকার ছিল, ভীষণ প্রয়োজন ছিল—শুধু আমার নয়, আমাদের সবার জন্যই।
ইলাস্ট্রেশন: সজীব রায়, পূর্ণতা সন্ধি, অভিমুন্য সরকার


