অনেক ঘটনাপ্রবাহের পর ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় বসছে বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। ইতিমধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রপতির ভাষণদানকে কেন্দ্র করে প্রথম দিনই সংসদ উত্তপ্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছে বিরোধী দল।
জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতারা বলছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে সরকারি দল বিএনপির ভূমিকার ওপরই বিরোধী দলের আচরণ নির্ভর করছে।
সংসদ সচিবালয় ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, অধিবেশনের প্রথম দিনেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করায় এবং ডেপুটি স্পিকার কারাগারে থাকায় বিএনপির সিনিয়র সংসদ সদস্য ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে পারেন।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর তাদের শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এরপর রাষ্ট্রপতির উদ্বোধনী ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে সংসদীয় কার্যক্রম। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির এই ভাষণ নিয়ে সংসদে আপত্তি তুলতে পারে বিরোধী দল। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় ওয়াক আউটের ঘটনাও ঘটতে পারে।
এবারের সংসদে প্রধান উত্তাপের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘জুলাই সনদ’ ও ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ইস্যু। জুলাই আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া এই সনদের ভিত্তিতেই নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও নির্বাচন হয়েছে। বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে পৃথক শপথ নিলেও বিএনপির সদস্যরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
বিএনপির নেতাদের দাবি, বিষয়টি সংবিধানের এখতিয়ারভুক্ত না হওয়ায় তারা সংসদে সংশোধনীর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে চান । তবে বিরোধী জোট মনে করছে, এটি মূলত সংস্কার প্রশ্নে সরকারের সদিচ্ছার পরীক্ষা ।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এ বিষয়ে টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, বিএনপি যদি জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দেওয়া জুলাই সনদ মেনে সংস্কারের পথে হাঁটে, তবে তারা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন। তা না হলে সংসদ ও রাজপথ—উভয় জায়গাতেই তীব্র প্রতিবাদ জানানো হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
একইভাবে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন জানান, সংসদের প্রথম দিনেই সরকারি দলের বক্তব্যে তাদের অবস্থান স্পষ্ট হবে। তার মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে সংবিধানের দোহাই দিলে খোদ নির্বাচনের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে।
এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও সংসদে প্রশ্ন তুলতে পারে বিরোধী দল।
এদিকে সংসদ শুরুর আগের দিন বুধবার বিএনপি চেয়ারপারসন ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের সভাপতিত্বে দলটির সংসদীয় দলের সভা ডাকা হয়েছে। এই সভায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করার পাশাপাশি সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি ও শৃঙ্খলা নিয়ে আলোচনা হবে।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদের জন্য নাম প্রস্তাব করতে বলা হয়েছে। তবে জামায়াত জানিয়েছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলে তারা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
এমন রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেও সংসদকে কার্যকর করার বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কিছুটা ইতিবাচক আলাপ হয়েছে। এরই মধ্যে সরকারি দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলামের সঙ্গে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের একটি বৈঠক হয়েছে। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান ও এনসিপির হাসনাত আব্দুল্লাহ। বৈঠকে একটি ‘ঐক্যমতের সরকার’ প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় স্বার্থে সংসদকে প্রাণবন্ত করার বিষয়ে উভয় পক্ষই গুরুত্বারোপ করেন।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার সংসদের প্রতিটি কার্যক্রমে বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
নতুন এই সংসদের সামনে বিশাল আইনি চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশকে প্রথম অধিবেশন থেকে পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আইনে রূপান্তর করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তা না হলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং নতুন বাংলাদেশ গঠনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা এই সংসদে কতটা প্রতিফলিত হয় তা দেখার অপেক্ষায় আছে রাজনৈতিক মহল।


