ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদল আরও তীব্র হয়েছে। আবারও এই সংকটের কেন্দ্রে চলে এসেছে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি।
শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে প্রত্যর্পণের জন্য ঢাকার প্রকাশ্য আহ্বান আবারো এই অঞ্চলে প্রথাগত কূটনীতির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে। এই এলাকায় বক্তৃতা-বিবৃতি নয়, সবকিছুর ফলাফল নির্ধারণ করে ভূ-রাজনীতির কৌশলগত স্বার্থ।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ফেসবুকে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দুই দণ্ডিত আসামি ফেরতের আহ্বান জানিয়েছে। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করেছে প্রেস ব্রিফিং। এটি অনেক কূটনীতিকের কাছেই অপ্রত্যাশিত মনে হয়েছে। কারণ নয়াদিল্লি রাজনৈতিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিকে বৈধ কূটনৈতিক যোগাযোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। সামাজিক মাধ্যমের বিবৃতিকে তো একেবারেই না।
ভারতের কাছে শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নোট ভারবালের মতো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ারই আইনি বা কূটনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। এই কাঠামোর বাইরে যে কোনো কিছুকে তারা শুধু নিজ দেশের মানুষকে তুষ্ট রাখার রাজনীতি হিসেবে দেখে।
একারণেই বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ব্রিফিং-বিজ্ঞপ্তির মন্তব্যগুলো ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের জন্য নয়। ঢাকার এসব আহ্বান ছিল বাংলাদেশের মানুষকে তুষ্ট করার জন্য। জনগণের কাছে এই সরকারের ভারতের বিরুদ্ধে ‘দৃঢ়তা’ দেখানোর দরকার ছিল, সেটাই করেছে।
ঢাকার বার্তা প্রতীকী হতে পারে, কিন্তু ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল কৌশলগত। গত কয়েক সপ্তাহে, ভারতীয় সামরিক বাহিনী শিলিগুঁড়ি করিডোরের —যে সংকীর্ণ ফালিটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে—এর আশেপাশে সশস্ত্র বাহিনীর ঘাঁটি জোরদার করেছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের চোপড়া এবং আসামের ধুবড়িতে নতুন ঘাঁটিগুলো স্থাপন থেকে বোঝা যায় যে বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক পালাবদল এবং চীনের আঞ্চলিক প্রভাব গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দিল্লির উদ্বেগ বাড়ছে।
সীমান্তে ভারতের এই সেনাশক্তি জোরদার করার সময়টা একটা বার্তাও বহন করে। সেটি হচ্ছে নয়াদিল্লি তার পূর্বাঞ্চলে স্থিতিশীলতা আশা করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, জোট বদল ও বাংলাদেশি গোষ্ঠীগুলোর সীমান্ত পেরিয়ে তৎপরতার সম্মিলিত প্রভাব দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
দু’এক দিনের মধ্যে ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের দেখা হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সাক্ষাতে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার যে কোনো অনানুষ্ঠানিক আলোচনা ভারত সরাসরি খারিজ করে দেবে। একজন সাবেক ভারতীয় কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘অজিত দোভাল আলোচনা থামিয়ে দেবেন। এতে বুঝিয়ে দেওয়া হবে এই রাজনৈতিক আশ্রয়গ্রহণকারীদের বিষয়ে ভারত কতটা সংবেদনশীল।’
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এখনও নয়াদিল্লির পূর্ণ রাজনৈতিক আস্থা অর্জন করতে পারেনি। ভারত প্রকাশ্যে ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’-এর নীতি গ্রহণ করেছে। তারা ঢাকার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত, তবে জামায়াতে-ইসলামী এবং এনসিপির মতো দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে তারা খুবই সতর্ক। কারণ এদেরকে তারা কঠোর ভারত-বিরোধী বলে মনে করে।
একই সময়ে, বিএনপি মনে করে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি দিল্লিকে তাদের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প রাখেনি। তবে, ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দলগুলোর রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে যোগাযোগের ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন বলে মনে হচ্ছে।
তাদের হিসাব-নিকাশ সহজ: ভারত আদর্শগত ঝোঁকের চাইতেও যাকে আগেভাগে বোঝা যায় সেই প্রতিবেশীদের পছন্দ করে।
বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে, যা পলাতকদের হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য ২০১৬ সালে সংশোধনও করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও, বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে। শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ঢাকা আগেও চিঠি দিয়েছে। নয়াদিল্লি সেই চিঠির প্রাপ্তিস্বীকার করলেও কোন জবাব দেয়নি।
চুক্তিটি একটি দেশকে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা দেয়, যদি অপরাধটিকে ‘রাজনৈতিক প্রকৃতির’ বলে মনে করা হয়। তবে, খুনের মতো অপরাধকে রাজনৈতিক প্রকৃতির হিসাবে গণ্য করা যাবে না।
তবুও, ভারত এই ধারাটিকে তার প্রয়োজন অনুসারে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেবে।
সাবেক বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূতরা বলেছেন, নয়াদিল্লি শেখ হাসিনাকে একটি মূল্যবান কৌশলগত সম্পদ হিসাবে দেখে। শেখ হাসিনার রয়েছে গভীর নেটওয়ার্ক, ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসে সম্ভাব্য প্রভাব। শেখ হাসিনা ভারতের মাটিতে থাকাকালীন সময় ভারতও এই সুবিধা কাজে লাগাতে পারে।
এছাড়া ভারতের দিক থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের প্রত্যর্পণ করার নজিরও প্রায় নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সমন্বয় এবং একটি সুষ্ঠু বিচারের নিশ্চয়তা না থাকলে তারা প্রত্যর্পণ করে না। বর্তমানে বাংলাদেশে এই শর্তগুলোর কোনোটিই বিদ্যমান নেই।
একজন সাবেক রাষ্ট্রদূত টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ঢাকায় কেবলমাত্র একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক ফ্রন্টই ভারতের অবস্থানকে অর্থপূর্ণভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তবে আওয়ামী লীগ-বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে গভীর বিভাজনের কারণে সেই একতা অসম্ভব।
তিনি বলেন, ‘ঐক্য কেবল হাসিনার প্রত্যাবর্তনের জন্যই নয়, বরং ভারতের মাটি থেকে আওয়ামী লীগের কার্যকলাপের ওপর যেকোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার জন্যও অপরিহার্য। বাংলাদেশের শক্তিগুলো যত বেশি বিভক্ত থাকবে, ভারতের পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনা তত কম হবে।’
আপাতত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢাকার আহ্বান দেশে সাড়া জাগাতে পারে। কিন্তু বিদেশে সেগুলোর কূটনৈতিক শক্তি নেই। একজন ভারতীয় কূটনীতিক বলেন, ভারত কোনো বিবৃতির ভিত্তিতে—বিশেষ করে যা আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের বাইরের অনুরোধে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে না।
এই ঘটনাটি একটি বড় শিক্ষা তুলে ধরে। যেই অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য নেই, সেখানে বক্তৃতা-বিবৃতির কূটনীতিতে কোনো কাজ হয় না। শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে চাইলে প্রয়োজন সুসংগঠিত কূটনীতি, ধারাবাহিক বার্তা এবং রাজনৈতিক সংহতি।


