আসন্ন জাতীয় বাজেটে উৎপাদন খরচ কমানো, কর ব্যবস্থা সহজ করা এবং স্বল্প সুদে অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে শিল্প খাতকে স্থিতিশীল রাখতে এই পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে। এই বাজেট নিয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের আশা, সরকার বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে বাস্তবমুখী ও সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
ব্যবসায়ীরা জানান, ২০২০ সালের মার্চ থেকে শুরু করে শিল্প খাত দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। করোনা অতিমারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্ব বাণিজ্য পরিস্থিতির অস্থিরতা, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতি, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ফলে শিল্প মালিকরা বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। এই ধারাবাহিক ধাক্কার ফলে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান এখনও ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় রপ্তানি খাত বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, একটি দূরদর্শী ও সমন্বিত বাজেট ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, গত ছয় বছরে শ্রমিকদের মজুরি প্রায় ৯৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে জ্বালানি তেলের দাম ১৮০ শতাংশ এবং বিদ্যুতের দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং পরিবহন খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগের চেয়ে বিদ্যমান শিল্প টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আসন্ন বাজেটে তারা উৎপাদন খরচ কমানোর উপায়, কর প্রণোদনা এবং নীতিমালার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার প্রতিফলন দেখতে চান।
সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য একটি বড় আকারের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। যদিও সরকার কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, তবুও ধারণা করা হচ্ছে বাজেটের আকার হবে প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার চেয়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ। দেশের মোট কর্মসংস্থানের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এই খাতের মাধ্যমে হয়। প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের জীবিকা সরাসরি শিল্প খাতের ওপর নির্ভরশীল।
টিকে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার বলেন, বর্তমান অবস্থায় এমন একটি কর ও শুল্ক নীতি প্রয়োজন যা কেবল রাজস্ব আদায়ের দিকে নজর না দিয়ে উৎপাদন ও বিনিয়োগকেও সুরক্ষা দেবে।
তিনি মনে করেন, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন খরচ এবং জ্বালানি সংকটই এখন ব্যবসার সবচেয়ে বড় বাধা। এই প্রেক্ষাপটে তিনি কাঁচামাল আমদানির ওপর অগ্রিম কর (এটি) এবং অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সংস্কার বা কমানোর ওপর জোর দেন। বর্তমানে আমদানির পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ কর হিসেবে আটকে থাকে এবং এই টাকা ফেরত পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এতে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর চলতি মূলধনের সংকট তৈরি হয়। এই করগুলো কমালে বাজারে তারল্য বাড়বে এবং উৎপাদন সচল রাখা সহজ হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
যমুনা গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ শামসের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ছাড় আরও সহজ করার দাবি জানান। সেই সঙ্গে তিনি করপোরেট করের হার অন্তত ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করেন। তার মতে, এর ফলে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে এবং কর্মসংস্থান তৈরির গতি বাড়বে।
ব্যবসায়ী নেতারা কর ব্যবস্থা আধুনিকায়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা মনে করেন, কর পরিশোধ প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল ও অটোমেটেড করা হলে হয়রানি কমবে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও হ্রাস পাবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো এবং ভ্যাট প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এছাড়া কর অবকাশ সুবিধা বা ট্যাক্স হলিডে হুট করে বন্ধ না করে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করার প্রস্তাব দেন উদ্যোক্তারা। একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলে বিনিয়োগকারীরা আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, উচ্চ সুদের হার এবং জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়ার ফলে সামগ্রিক ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে তারা পণ্যের দাম বাড়াতে পারছেন না। ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে মূলধনী বিনিয়োগের ঋণের মেয়াদ সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় বছর। অথচ প্রতিযোগী দেশগুলোতে ১২ থেকে ১৫ বছর মেয়াদী স্বল্প সুদের ঋণ দেওয়া হয়। স্বল্প মেয়াদী ও উচ্চ সুদের এই ঋণ ব্যবসায়ীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক এই সভাপতি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেন। তিনি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে বিশেষ প্যাকেজ এবং নীতিমালার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, রপ্তানি খাতের জন্য বাজেটের বাইরেও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। তিনি রপ্তানির ওপর বর্তমান ২ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা এক বছরের জন্য বাড়িয়ে অন্তত ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন। সেই সঙ্গে তিনি রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) ২ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং রপ্তানি ঋণ প্রকল্প অন্তত দুই বছরের জন্য পুনরায় চালুর দাবি জানান।


