স্বাধীনতার পর একটি স্বতন্ত্র শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে এ দেশের সরকারগুলো সময় নিয়েছে দীর্ঘ ৩৯ বছর। অবশেষে ২০১০ সালে দেশের প্রথম একটি কার্যকর শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হলেও, পরবর্তী ১৬ বছরে এর অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।
মূলত সরকারের অঙ্গীকারের অভাব ও শিক্ষাকে যথাযথ অগ্রাধিকার না দেওয়ায় এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এমনকি শিক্ষানীতির কিছু সুপারিশকে আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব গণ্য করে ইতোমধ্যে সরকারের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলার নজিরও দেখেছে দেশবাসী।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ ‘ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া’ যোগসূত্রের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষাকে অর্থবহ করা এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাকে ‘অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত’ বর্ধিত করার প্রস্তাব থাকলেও কোনোটিই আলোর মুখ দেখেনি। ২০১৮ সালের মধ্যে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্য থাকলেও ২০২৫ সাল পর্যন্ত তা সফল হয়নি। ফলে ১১ বছর পরীক্ষামূলকভাবে চালানোর পর, অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে এ বছর থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বর্ধিত করা ৭২৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি বন্ধ করে দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. রিয়াজ পারভেজ মনে করেন, শুধু সরকারের সদিচ্ছার অভাবে শিক্ষানীতির এই বিষয়টি ভেস্তে গেছে। তিনি বলেন, ‘শুধু কাগজে-কলমে পাইলটিং করা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়নের উদ্যোগই নেয়নি সরকার। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে গত ১৬ বছরে মানসম্মত শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকট কাটিয়ে সারা দেশের সব প্রাথমিকেই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালু করা যেত।’
শিক্ষাবিদরা বলছেন, প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত কারিকুলামের আধুনিকায়ন ও ধারাবাহিকতা রক্ষার কথা থাকলেও তা নিরবচ্ছিন্নভাবে হয়নি। কখনো রাজনৈতিক চাহিদা, আবার কখনো আমলাদের খেয়ালখুশি মতো বিচ্ছিন্ন কিছু কাজ হয়েছে। তারা মনে করেন, শিক্ষাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা জরুরি। এ ছাড়া শিক্ষা প্রশাসনে প্রকৃত শিক্ষাবিদদের বদলে আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপের কারণে কারিকুলাম নিয়ে বিতর্ক থামছে না।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সাতটির বেশি শিক্ষা কমিশন গঠিত হলেও কোনোটির সুপারিশই বাস্তবায়িত হয়নি। অবশেষে ১৯৭৪ সালের কুদরত-ই-খুদা কমিশন, ১৯৯৭ সালের শামসুল হুদা কমিশন এবং ২০০১ সালের এম এ বারী কমিশনের প্রতিবেদনের আলোকে ২০১০ সালে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে দেশের প্রথম শিক্ষানীতি হয়।
এই শিক্ষানীতিতে উচ্চশিক্ষায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, শান্তি ও সংঘাত এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে পাঠদানের কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা নেই। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের পাঠ্যসূচিতে জলবায়ু বিষয়ে কন্টেন্ট যোগ করা হলেও উচ্চশিক্ষায় তা এখনো বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক স্তরে সরকারি-বেসরকারি, কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসায় সমন্বয় করে একই পদ্ধতির মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সব স্কুলকে নিবন্ধনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে এটি এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, একই পদ্ধতিতে সবাইকে টেনে আনার চেয়ে ভাষা ও গণিতের মতো মূল বিষয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা বেশি জরুরি।
বর্তমানে কিন্ডারগার্টেনগুলোর নিবন্ধন না হওয়া এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা থেকে বিরত রাখার চেষ্টার মতো জটিলতায় ২০২৫ সালের বৃত্তি পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, ‘বৃত্তি পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা যে ১০০ টাকা করে রেজিস্ট্রেশন ফি দিয়েছিল, সেই অর্থের কী হবে তা নিয়ে এখন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’
শিক্ষানীতিতে শুদ্ধভাবে বাংলা ও ইংরেজি পড়ার লক্ষ্য থাকলেও সরকারের ‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিট’-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। গত বছরের ১০ মাসে ২১টি জেলার ৩ হাজার ৫৩০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রায় ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে পড়তে পারে না। অভিভাবকরাও বলছেন, আগে পঞ্চম শ্রেণি পাস করা ব্যক্তিরা ইংরেজি পত্রিকা পড়তে পারলেও এখনকার অনেকে পাঠ্যবইও ঠিকমতো পড়তে পারে না।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগের কথা থাকলেও বিশেষ প্রশিক্ষক বা শিখন সামগ্রী ছাড়াই নামমাত্র অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা চলছে। গত বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রাথমিক স্তরে এক লাখ দুই হাজার ৬৫৬ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর মধ্যে সরকারি প্রাথমিকে পড়ছে ৪৭ হাজার ৬৮৯ জন। এদের মধ্যে পাঁচ হাজার ৯৭৮ জন দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী কোনো ব্রেইল বা সাংকেতিক ভাষা ছাড়াই পড়াশোনা করছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের ঘাটতি স্বীকার করে বলেন, ‘তাদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে পারলে ভালো হতো।’
শিক্ষানীতিতে খেলাধুলা ও শরীরচর্চার কথা থাকলেও নবম-দশম শ্রেণির শারীরিক শিক্ষা বইয়ে ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বড় ধরনের ভুল পড়ানো হয়েছে, যা কারো চোখে পড়েনি। শিক্ষার্থীরা জানায়, ১০০ নম্বরের পরীক্ষা হলেও মূল রেজাল্টে নম্বর যোগ না হওয়ায় শিক্ষকরা এটি পড়ান না এবং কোনো শারীরিক কার্যক্রমও চলে না।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ মনে করেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতির কারণে শিক্ষায় মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। তিনি বলেন, শিক্ষানীতি শুধু প্রণয়ন করলেই হয় না, বাস্তবায়ন কৌশল, অর্থায়ন ও মনিটরিং প্রয়োজন। বিগত দিনগুলোতে শিক্ষাবান্ধব নেতৃত্বের অভাব ছিল। তবে নতুন সরকার অগ্রাধিকার দিলে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।
তিনি আরও যোগ করেন, শিক্ষানীতিতে বড় পরিবর্তন না এনে বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনায় মনোযোগ দেওয়া উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা অনুষদের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, ২০১০ সালে শিক্ষানীতি হলেও প্রকৃতপক্ষে সরকারের কাছে শিক্ষা অগ্রাধিকার পায়নি। বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই নীতি সংস্কার ও পরিমার্জন করা প্রয়োজন। তা না হলে প্রত্যাশা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা যাবে না।


