ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ফলে দেশের প্রধান এই বিমানবন্দরে সব ধরনের উড়োজাহাজ ওঠানামা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় অনেকে আহত হয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিসের ৭ সদস্য আহত
ভয়াবহ আগুন লাগার ৬ ঘণ্টা পার হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। আগুনের শিখা আর ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে আশপাশের আকাশ। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি স্টেশনের মোট ৩৭টি ইউনিট বর্তমানে কাজ করছে।
এদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৭ জন সদস্য আহত হয়েছেন। আহদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ফায়ার সার্ভিসের গণমাধ্যম সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম।
যে কারণে নিয়ন্ত্রণে আসছে না আগুন
রাব্বি হাসান বাবু নামে এক ব্যবসায়ী জানান, কসমেটিকস ফ্যাব্রিক্স গ্যাজেটস আইটেম শনিবার সকালে সাউথ কোরিয়া থেকে দেশে এসেছিল। প্রতি শিপমেন্টে ৫ টনের ওপরে প্রোডাক্ট থাকে। ‘সব শেষ হয়ে গেছে।’
ফেব্রিকস, কাপড়, কেমিক্যাল, ওষুধের কেমিক্যাল ও মোবাইল ইলেকট্রনিকসের পার্টস থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হচ্ছে।
৯ ফ্লাইট চট্টগ্রাম ও সিলেটে অবতরণ
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত নয়টি ফ্লাইট ঢাকায় নামতে না পেরে চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে।
এর মধ্যে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটটি ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি ফ্লাইট অবতরণ করে।
চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মুখপাত্র মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল শনিবার বিকালে জানান, যে আটটি ফ্লাইট চট্টগ্রামে অবতরণ করেছে, তার মধ্যে দুটি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকামুখী অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ছিল।
অপর ৬টি ফ্লাইটের একটি ব্যাংকক থেকে, আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে ঢাকায় অবতরণ করার কথা ছিল। বাকি চারটিও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। এ সব ফ্লাইট ঢাকার বদলে চট্টগ্রামে অবতরণ করেছে।
ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটের কার্গো ভিলেজে এই আগুন লাগে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম।

রাত ৯টা পর্যন্ত ঢাকার সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চট্টগ্রামে
ঢাকার হযরত শাহ জালাল বিমানবন্দরেরর রাত ৯টা পর্যন্ত সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণ করবে বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম খলিল।
তিনি বলেন, ‘হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারফিল্ড শনিবার রাত ৯টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। ঢাকা থেকে আরও ৪টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ডাইভার্ট হয়ে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ফিরে আসছে। আরও ছয়টি নামার সম্ভাবনা রয়েছে।’
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর বিমানবন্দরের সব ধরনের উড়োজাহাজ ওঠানামা সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। ফলে এ সময়ে ঢাকার শাহজালালের পথে থাকা উড়োজাহাজ চট্টগ্রামে অবতরণ করে।
এর আগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের আগুন আমদানি বিভাগে ছড়িয়ে পড়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণেে এ পর্যন্ত ১৩ ফায়ার স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের কারণে বিমানবন্দরে সব ধরনের ফ্লাইট ওঠানামা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। ঢাকাগামী দু’টি অভ্যন্তরীণ ও দু’টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে।
আগুনের কারণে রিয়াদ থেকে ঢাকাগামী একটি ফ্লাইট সিলেটে অবতরণ করেছে বলে জানা গেছে।
ফায়ার সার্ভিসের ইন্সিডেন্ট কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বিকাল ৫টার দিকে বলেন, ‘আগুন কার্গো ভিলেজের আমদানি বিভাগে ছড়িয়ে পড়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার হচ্ছে ফায়ার সার্ভিসের রোবট “এলইউএফ- সিক্সটি”।’
তিনি আরো জানান, সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। আগুন নেভাতে গিয়ে আহত হয়েছেন এক আনসার সদস্য।

আনসারের ২৫ সদস্য আহত
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো ভিলেজের ৮ নম্বর গেটের পাশে আমদানিকৃত কেমিক্যাল, গার্মেন্টস, ইলেকট্রনিকস ও মেশিনারিজ পণ্যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে অংশ নিয়ে ২৫ জন আনসার সদস্য আহত হয়েছেন।
শনিবার সন্ধ্যায় পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, দুপুর আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে আগুনের সূত্রপাতের পর ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে।
একই সঙ্গে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা যৌথভাবে আগুন নেভানোর কাজে অংশ নেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রায় এক হাজার আনসার সদস্য ঘটনাস্থলে থেকে উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সহায়তা করছেন। আগুন নেভানোর সময় ২৫ জন আনসার সদস্য আহত হন। তাদের দ্রুত সিএমএইচ এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
উত্তর জোন কমান্ডার মো. গোলাম মৌলাহ তুহিন ঘটনাস্থল থেকে বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ড শুরুর মুহূর্তেই আনসার সদস্যরা আগুন টের পেয়ে কর্তৃপক্ষকে জানান এবং নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।’
আনসার বাহিনী জানায়, পুরো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে তদারক করা হচ্ছে এবং আহত সদস্যদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ কর্মকর্তা বুশরা ইসলাম বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে, আগুনের ভয়াবহতার কারণে আমরা কাছে যেতে পারছি না।’
তিনি জানান, ঢাকাগামী সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইটকে চট্রগ্রামে অবতরণ করতে বলা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে আগুন লাগার কারণ জানা যায় নি।
বিমান কর্মকর্তা বুশরা বলেন, তারা কার্গো সেকশনে সংরক্ষিত বিদেশ থেকে আমদানি করা সকল পণ্য ভস্মীভূত হওয়ার আশংকা করছেন।
তিনি জানান, বিমানবন্দরে দুর্ঘটনাস্থলের কাছ থেকে স্কাই এয়ারের একটি বিমান টেনে সরানোর চেষ্টা চলছে, বিমানটি ঝুকিপূর্ণ অবস্থানে ছিল।

কার্গো টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের কারণে ঢাকার হযরত শাহ জালাল বিমানবন্দরের বদলে চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে চারটি ফ্লাইট। শনিবার বিকাল ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে দুটি চট্টগ্রাম-ঢাকাগামী অভ্যরন্তরীণ ফ্লাইট এবং অপর দুটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট।
শাহ আমানত বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম খলিল এসব তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, অভ্যন্তরীণ দুটি ফ্লাইট ছাড়াও চট্টগ্রামে অবতরণ করা দুটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের মধ্যে একটি ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যাংকক-ঢাকা এবং আরেকটি এয়ার আরাবিয়ার মধ্যপ্রাচ্য-ঢাকা রয়েছে।
বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের মুখপাত্র মো. মাসুদুল হাসান মাসুদ গণমাধ্যমকে জানান, শাহ আমানত বিমানবন্দরের ফ্লাইট ওঠানামা সাময়িক বন্ধ রয়েছে।
এর আগে, ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া অফিসার তালহা বিন জসিম জানান, শনিবার বেলা সোয়া ২টার দিকে সেখানে আগুন লাগার খবর পান তারা। তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ২০টি ইউনিট কাজ করছে। আরো ১২টি ইউনিট ঘটনাস্থলে যাচ্ছে।’
এর পরপরই বিমানবন্দর ফায়ার সার্ভিস, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ফায়ার ইউনিট এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা সেখানে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করে।
উদ্ধার সহায়তায় যোগ দিয়েছে বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর ২ প্লাটুন সদস্য।

আন্তঃবাহিনী গণসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বিমানবন্দরের কার্গো সেকশনে অগ্নি নির্বাপণে কাজ করছে সিভিল এভিয়েশনসহ ফায়ার সার্ভিস এবং বিমান বাহিনীর দুটি ফায়ার ইউনিট।
কীভাবে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়, এখনো নিশ্চিত করে তা কেউ জানাতে পারেনি।


