কোরবানির ঈদে প্রায় প্রতি বছর যেসব কারণে চামড়ার দরপতন ঘটে, সেগুলোর প্রতিটিই এবারও রয়ে গেছে। পুরোনো সংকটের পাশাপাশি তীব্র গরমও এবার সমস্যা হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা।
ঈদের ছুটির আগে আগে পুরান ঢাকার পোস্তায় কাঁচা কামড়া ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে জানা গেল, গত বছর তো বটেই আগের বহু বছরের বকেয়া জমে শত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
দুই দশক আগেও ঈদের চামড়া সংগ্রহকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রতিযোগিতা দেখা গেলেও এখন সেই চিত্র আর নেই। প্রায় প্রতি বছর মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লোকসান দিয়ে আগ্রহ হরিয়ে ফেলছেন। গত বছর ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বড় বড় শহরে চামড়া ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কয়েক বছর ধরেই কাঁচা চামড়া বিক্রি না করে মাটিতে পুঁতে ফেলা হচ্ছে ক্ষোভে।
ব্যবায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজার হারানো, বকেয়া অর্থের সংকট এবং পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স সংকট মিলিয়ে পুরো খাতের গতি কমে গেছে।
কোরবানির পশুর চামড়ার দাম বর্গফুটপ্রতি এবার ২ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ বিনামূল্যে বিতরণের ঘোষণাও এসেছে। ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ঠিক করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, ঢাকার বাইরে তা ৫৭ থেকে ৬২ টাকা।
তবে পুরান ঢাকার কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী মো. আবদুস সালাম টাইমস অব বাংলাদেশকেক বলেছেন, ‘আমাদের খরচ আরও বেশি বেড়েছে। লবণ, পরিবহন ও শ্রমিকের মজুরি সবকিছুর দাম বেড়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের লাভের সুযোগ খুবই সীমিত।’
চামড়া সংগ্রাহক মো. শাহীন মোল্লা বলেন, ‘সরকার দাম বাড়ালেও বাস্তবে আমরা সেই দাম পাই কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। স্থানীয় আড়তদাররা কম দামে কিনতে চায়, আবার চামড়া বেশি সময় রাখলেও নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। তাই অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়।’
পুরোনো দেনা আর ঋণ প্রাপ্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা
পোস্তার কাঁচা চামড়ার আড়তদার মো. জাহাঙ্গীর আলম টাইমসকে বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মূলধনের সংকট। ট্যানারিগুলোর কাছে আগের বছরের পাওনা এখনো বাকি আছে। টাকা না পেলে নতুন করে চামড়া কেনার সক্ষমতা তৈরি হয় না।’
কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সমিতি বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনজুর হাসান বলেন, ‘প্রস্তুতি নির্ভর করছে আমরা ট্যানারিদের কাছে যে টাকা পাব, তার ওপর।’
কাঁচা চামড়ার ব্যবসার পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাই দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া অর্থের সংকটে ভুগছে। শুধু চলতি বছরের নয়, আগের বছরেরও বিপুল পরিমাণ পাওনা এখনো টেনারিগুলোর কাছে আটকে আছে। সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের আগ থেকেই প্রায় ১০০ কোটি টাকার পাওনা বকেয়া রয়েছে বলে জানান তিনি।
মনজুরের ভাষায়, ‘পুরো চেইনটাই সমস্যার মধ্যে আছে। ট্যানারিগুলো টাকা দিতে পারছে না। শুধু বলছে দিচ্ছি, দেব। আশ্বাসের ওপরই সব চলছে।’
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান আশিকুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘ব্যবসা তো চলেই ভরসার ওপর। এমন টুকটুক তো থাকবেই।’
তার মতে, খাতটির আর্থিক ঝুঁকি এবং খেলাপি ঋণের চাপ নতুন বিনিয়োগ ও অর্থায়নকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ‘পুরো চামড়া শিল্প খাতে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর কাছেই ৫ হাজার কোটির বেশি পাওনা রয়েছে’, বলেন আশিকুর।
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য কাঁচা চামড়া কেনা ও সংরক্ষণে ব্যবসায়ীদের বিশেষ ঋণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। চামড়া খাতের পুরোনো ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে কিস্তি আদায়ে শর্ত শিথিল করা হয়েছে, যাতে তারা নতুন করে ঋণ নিয়ে চামড়া কিনতে পারেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এ বছর চামড়া খাতে ঋণ বিতরণের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা কোনোভাবেই গত বছরের চেয়ে কম হতে পারবে না।
তবে জনতা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী আব্দুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য কোনো বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, স্বল্পসুদে ঋণ কর্মসূচি বা এ ধরনের কোনো বিশেষ প্রণোদনা বা নির্দেশনা এখন পর্যন্ত আমরা পাইনি।’
ব্যবসায়ীরাও বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যাই বলা হোক, তারা ঋণ পান খুবই কম। ব্যাংক খাতের তথ্য বলছে, গত বছর ৬৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ঋণ বিতরণ হয় ৬৫ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে ৬১০ কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয় ১২৫ কোটি টাকা এবং ২০২৩ সালে ৪৪৩ কোটি টাকার মধ্যে বিতরণ হয় ২৭০ কোটি টাকা।
চামড়া খাতে ঋণ দিয়ে বিপাকে আছে জনতা ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ব এই ব্যাংকটির ডিএমডি কাজী আব্দুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘ব্যাংক ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সাধারণত আর্থিক সক্ষমতা, পূর্ববর্তী লেনদেনের ইতিহাস, জামানত, নগদ প্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো) এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনা করা হয়। মৌসুমি ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে এসব তথ্য-উপাত্ত বা নথিপত্র পর্যাপ্তভাবে পাওয়া যায় না।’
‘অনেক সময় দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত ঋণসীমার আওতায় অর্থ গ্রহণ করলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সমন্বয় বা পরিশোধ করতে পারেন না। আবার অনুমোদিত ঋণসীমা পুরোপুরি ব্যবহার হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে অর্থায়নের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে’, বলেন তিনি।
দুশ্চিন্তার আরেক নাম লবণ
ঈদের চামড়া ব্যবসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ। বিশেষ করে কোরবানির পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চামড়ায় লবণ না লাগালে তা দ্রুত পচে যায়। এবার তাপমাত্রা বেশি থাকায় সেই ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
মৌসুমি ব্যাবসায়ী মো. সোহেল রানা বলেন, ‘ঈদের দিন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চামড়া সংগ্রহ ও লবণজাত করতে হয়। গরম বেশি থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। সামান্য দেরি হলেই চামড়ার মান নষ্ট হয়ে যায়, তখন লোকসান গুনতে হয়।’
ব্যবসায়ী মনজুর হাসানও বলেন, ‘চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে চামড়া লবণজাত করতে হয়। দেরি হওয়ার কারণে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়।’
এখানেই তৈরি হয়েছে সমস্যা। লবণের দাম বাড়ায় ব্যবসায়ীদের ব্যয়ও বেড়েছে। মনজুর বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় প্রতি বস্তা লবণের দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে। ফলে অতিরিক্ত খরচের প্রভাব চামড়ার দামের ওপরই পড়বে।’
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে এখনো মৌসুমি ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ চামড়া সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি জানেন না।
মনজুর বলেন, ‘তারা দেরিতে চামড়া নিয়ে আসেন। তখন আমরা সেই চামড়া নিতে চাই না।’
প্রশাসন ও মন্ত্রণালয় পর্যায়ে একাধিক বৈঠকে মাদ্রাসাগুলোকে ঈদের দিন মাগরিবের আগেই চামড়া বিক্রি বা লবণজাত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কারণ, কোরবানির বড় অংশের চামড়া মাদ্রাসাগুলোতে যায়। সরকারও এবার বিভিন্ন মাদ্রাসায় লবণ সরবরাহ করছে, যাতে দ্রুত সংরক্ষণ সম্ভব হয়।
এবার বাড়তি দুশ্চিন্তা হলো আবহাওয়া। গ্রীষ্মের উত্তাপ বাড়ছেই। সেই সঙ্গে মাঝেমধ্যেই হচ্ছে ঝুম বৃষ্টি। কোরবানির দিন যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে সময় মতো চামড়া সংগ্রহ আর তাতে লবণ মেশানো সমস্যাসংকুল হয়ে যাবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর এরই মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টির সম্ভাবনা অবশ্য তুলনামূলক কম দেখছে তারা।
অধিদপ্তর মে মাসের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি হতে পারে বলে আগেই জানিয়েছে। তবে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের ওয়েবসাইট অ্যাকু ওয়েদার জানাচ্ছে, তামপাত্রা আর তাপের অনুভূতির মধ্যে পার্থক্য আছে। তাপের অনুভূতি এরই মধ্যে ৪১ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেছে।
বড় সংকট রপ্তানি বাজার হারানো
কোরবানির চামড়া শিল্পের সংকট এখন শুধু মৌসুমি নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তরের পরও আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ না হওয়ায় বাংলাদেশ প্রত্যাশিত রপ্তানি বাজার ফিরে পায়নি।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনজুর হাসান বলেন, ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার শর্তে টেনারি স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সাভারে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
তার ভাষায়, ‘ইউরোপের কোনো ক্রেতাই এখন বাংলাদেশ থেকে চামড়া কিনছে না। আমরা এখন প্রায় পুরোপুরি চীনা ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছি। বর্তমানে আমরা প্রায় শতভাগ চীনা ক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছি। তারাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে এবং মূলত তারাই দামের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।’
তিনি জানান, বর্তমানে ১৫৪টি ট্যানারির মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ৩০টি ভালোভাবে চলছে। বাকিগুলোর অনেকই বন্ধ হয়ে গেছে বা সংকটে রয়েছে।
ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা আশিকুর রহমানও বলছেন, ইউরোপের বাজার হারানোর পর চীনা ক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছেন তারা। দাম নির্ধারণেও তাদের প্রভাব বেড়েছে।


