চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তিন মাস বাকি থাকতেই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি এবং বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ দীর্ঘসময় ধরে স্থবির হয়ে থাকায় সরকার এখন ব্যয় মেটাতে ব্যাংক খাতের ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপকে স্পষ্ট করে তুলছে।
পুরো অর্থবছরের জন্য ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থবছরের এই পর্যায়েই সরকার ইতিমধ্যে এক লাখ ১২ হাজার ১৭১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেলেছে। ঋণ গ্রহণের এই ধারা এখনও অব্যাহত রয়েছে। এমনকি মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ৯১ দিন মেয়াদী ট্রেজারি বিলের বিশেষ নিলামের মাধ্যমে সরকার আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতা সরকারকে এই ব্যাংক ঋণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অর্থবছরের প্রথম আট মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় করেছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, বছর শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ গত টানা আট মাস ধরে ছয় শতাংশের আশেপাশে আটকে আছে। এই চিত্রটি বিনিয়োগের চাহিদায় একটি দীর্ঘমেয়াদী মন্দার দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে যেমন রাজস্ব আয় কমছে ও বেসরকারি খাতের ঋণ গ্রহণ থমকে আছে, অন্যদিকে সরকার তার খরচ মেটাতে দেশীয় ব্যাংকগুলোর ওপর আরও বেশি নির্ভর করছে।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং বাজারের প্রতিক্রিয়া থেকেও এই নির্ভরতার প্রমাণ পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক রিভার্স রেপোর মাধ্যমে বাজার থেকে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলে নিলেও ট্রেজারি বিলের নিলামগুলোতে বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক সাড়া দেখা যাচ্ছে। গত ২ এপ্রিল পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিলের বিপরীতে ১৬ হাজার ৭৭২ কোটি টাকার আবেদন জমা পড়েছিল। কর্মকর্তাদের মতে, সপ্তাহের শুরুর দিকে আরও বড় অংকের তহবিল সংগ্রহের সুযোগ ছিল।
বাজারে ট্রেজারি বিলের মুনাফার হার বা কাট-অফ ইল্ড মার্চ মাসের আগে ১০ শতাংশের উপরে ছিল। বর্তমানে এই হার সামান্য কমলেও এখনও ১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি ৯১ দিন মেয়াদী বিলের হার ছিল ১০ দশমিক ০২ শতাংশ, ১৮২ দিন মেয়াদী বিলের হার ছিল ১০ দশমিক ১১ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদী বিলের হার ছিল ১০ দশমিক ০৭ শতাংশ। মার্চ মাস থেকে এই হার ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
১ এপ্রিলে ৯১ দিন মেয়াদী বিলের হার ছিল ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ, ২ এপ্রিলে ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ৫ এপ্রিলে ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। ঋণের খরচ চড়া থাকার পরেও ব্যাংকগুলোর এই বিল কেনার প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে পর্যাপ্ত তারল্য বা নগদ টাকা থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ছে না। গত জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর কাছে টাকা আছে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছেন না। এই বৈপরীত্যই বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতির মূল সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।
রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকারের অর্থের প্রাথমিক উৎস সংকুচিত হয়েছে। ফলে ব্যয় নির্বাহের জন্য ব্যাংক ঋণই এখন সরকারের একমাত্র তাৎক্ষণিক সমাধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত খরচ কমানোর সীমিত সুযোগ এবং বৈদেশিক অর্থায়ন পেতে দেরি হওয়ায় সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
মুদ্রানীতির দিক থেকে দেখা যাচ্ছে, বাজারে টাকার অভাব নেই বরং চাহিদার অভাব রয়েছে। ব্যাংকগুলো তাদের অলস টাকা বেসরকারি খাতে না দিয়ে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করছে।
এই পরিস্থিতি আপাতত স্থিতিশীল মনে হলেও তা অত্যন্ত ভঙ্গুর। বিশ্লেষকদের মতে, যদি বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায় এবং সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও একই থাকে, তবে ব্যাংক তহবিলের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হবে। এর ফলে সুদের হার আরও বেড়ে যেতে পারে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদী ট্রেজারি বিলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সরকারের সুদ পরিশোধের ব্যয় ও পুনঃঅর্থায়নের চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমান তথ্য-উপাত্ত স্পষ্ট করছে যে বাজারে পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারছে না।


